
চারপাশ বাঁধানো ছিমছাম সুন্দর পুকুরটির ওপাশে সোনারগাঁয়ের বড় সর্দারবাড়ি জ্বলজ্বল করছে। পুকুরঘাটের দুই পাশে চিরচেনা সেই আরোহীসহ ঘোড়া। চকচকে বিশাল ফটক। ভবনের ভেতরে অতীতকালের স্থাপত্যের কারুকার্য। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের পর নতুন যৌবন ফিরে পেয়েছে প্রত্ন স্থাপনাটি।
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে ঢোকার মুখেই বড় সর্দারবাড়ি। কবে তৈরি হয়েছে, সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ইতিহাস বলছে, মুসলিম শাসকদের আমলে ১২৯৬ থেকে ১৬০৮ সাল পর্যন্ত সোনারগাঁ বাংলার রাজধানী ছিল। ১৬০৮ সালে মোগল আমলে তদানীন্তন জাহাঙ্গীরনগর ও বর্তমান ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর হলে সোনারগাঁয়ের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য কমে যায়। ওই সময়েরই একটি ভবন হতে পারে এই বড় সর্দারবাড়ি।
আবাসিক ভবনের পেছনের আঙিনার চারপাশে তিনটি ভবন মোগল আমলের প্রথম দিকে নির্মিত। রাজকীয় সামনের অংশটি পশ্চিমের পুকুরধারে। পুকুরে তিনটি শান-বাঁধানো ঘাট। এখানে দুটি ঘোড়ার ওপর দুজন অশ্বারোহী সুসজ্জিত সৈনিক সর্দারবাড়ির প্রতিপত্তির সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
মোট ২৭ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ভবনের নিচতলায় ৪৭টি ও দোতলায় ৩৮টি কক্ষ। দ্বিতল বাড়ি দুটি ভাগে তৈরি হয়েছে। মধ্যভাগে লাল রঙের বর্গাকৃতি ভবনটি মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বড় সর্দার বাড়ির রেস্টোরেশন প্রকল্পের পরিচালক স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, মূলত এ ভবনটি ছিল বাণিজ্যিক। একটি ভবনেই প্রাক্ ইসলামি, প্রাক্ মোগল, বার ভূঁইয়া ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল—এই চারটি ভিন্ন সময়ের স্থাপত্যশৈলীর সমাবেশ বাংলাদেশের খুব কম ভবনেই ঘটেছে।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফেরা
বড় সর্দার বাড়ি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। আশির দশকে আংশিক সংস্কার করে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের সঙ্গে এটিকে সম্পৃক্ত করা হয়। ভবনটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা পোষণ করেন কোরিয়ার বহুজাতিক কোম্পানি ইয়াংওয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নাগরিক কিহাক সাং। ভবনটি পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন কোম্পানিটি।
আবু সাঈদ এম আহমেদ জানালেন, ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বড় সর্দার বাড়ির সংস্কারকাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে অবকাঠামোগত সব কাজ শেষ। এখন বাড়ির কক্ষগুলো সাজানোর কাজ চলছে। এখনো সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি।
প্রকল্পের উপদেষ্টা স্থপতি রবিউল হুসাইন প্রথম আলোকে বলেন, এটি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংরক্ষণের কাজ। তবে শুধু সংস্কার করে বসে থাকলে হবে না, একে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে হবে।
পানাম জাগবে ফের
বড় সর্দার বাড়ির খুব কাছেই সোনারগাঁর ইতিহাসের আরেক সাক্ষী পানাম নগরী। ২০০৬ ও ২০০৮ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ডের জরিপে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় শত নগরীর তালিকায় পানামের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পানামের জরাজীর্ণ ভবনগুলোর গায়ে মিশে আছে ৪০০ বছরের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলেও এ নগরীতে বেশ কিছু ভবন তৈরি হয়। ঔপনিবেশিক ধাঁচের দোতলা এবং একতলা বাড়ি রয়েছে প্রচুর, যার বেশির ভাগই ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি।
বর্তমানে পানাম নগরীতে ৫২টি ভবন রয়েছে। সরকারি তদারকির অভাবে অবৈধ দখল আর নির্বিচার ইজারাব্যবস্থা ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে গেছে ভবনগুলোকে।
জানা গেছে, সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানামের আদি রূপ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এই নগরীর সংস্কারের বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। কোরিয়ার ইয়াংওয়ান গ্রুপ এ নগরী সংস্কার করতে অর্থায়ন করতে চেয়েছে। তবে এ কাজটি শুরু করতে সময় লাগবে। বেসরকারি আর্থিক সহযোগিতা না পেলেও নিজেদের অর্থায়নে এই কাজটি করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান মন্ত্রী।