চার বছর আটকে আছে পোস্তগোলায় নৌ টার্মিনাল নির্মাণ
নদীর ৩ একর জায়গা দখল করে বালু ও ইস্পাত ব্যবসা

রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নতুন নৌ টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত স্থানসহ ভরাট করা তিন একর জায়গায় অবৈধভাবে লোহা ও ইস্পাতসামগ্রী এবং বালুর ব্যবসা চলছে। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে নদীর সীমানাখুঁটির মধ্যেও চলছে এই ব্যবসা।
এলাকা ঘুরে এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিচালন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, ২০০৯ সালে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের এই নির্দেশনার আগে সেখানে প্রতি বর্গফুট হিসাবে জায়গা ভাড়া দিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এতে বছরে কর্তৃপক্ষের আয় হতো প্রায় সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা। এখন এর কয়েক গুণ বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে দখলদারদের পকেটে। একই সঙ্গে চার বছর ধরে আটকে আছে পোস্তগোলায় নৌ টার্মিনাল নির্মাণের কাজ। এখানে টার্মিনাল করার উদ্দেশ্য, সদরঘাটের ওপর যাত্রীদের চাপ কমানো এবং পণ্যবাহী নৌযান (কার্গো) নোঙর করার স্থান সংকুলান করা।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই অবৈধ ব্যবসা করছেন বালু, ইস্পাত ও লোহা ব্যবসায়ীরা। বালুর ব্যবসা মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন শ্মশানঘাটের সাবেক ইজারাদার বালু ব্যবসায়ী ইব্রাহীম রিপন (বর্তমানে ঘাট রয়েছে ছোট ভাই ইকবাল আহমেদের নামে)। তিনি সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদ (এর আগে ঢাকা-৪ থেকে নির্বাচিত সাংসদ) সানজিদা খানমের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকা বন্দর বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, নদীর প্রায় তিন একর জায়গা দখল করে এই বালু ও ইস্পাত ব্যবসা চলছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নদীর অংশ ভরাট করা জায়গায় বালুর ব্যবসা চলছে। নতুন অংশ ভরাটও হচ্ছে। নদীর তীরে অনেক ট্রাক জড়ো করা। বালু তোলা হচ্ছিল। কয়েকজন ট্রাকচালক বলেন, মেঘনা নদী থেকে ট্রলারে করে এখানে বালু আসে। দিনে-রাতে তাঁরা ট্রাকে করে এসব বালু বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দেন। এ কাজে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক ব্যবহৃত হয়। প্রতি ট্রাক বালুর দাম ৭০০ টাকা।
নদীর তীরে কিছু দোকানঘরের মতো স্থাপনা দেখা গেল। এগুলো ট্রানজিট শেড নামে পরিচিত। এখানে মূলত ইস্পাত ও লোহার বড় বড় পাত বেচাকেনা হয়। একটি স্থাপনায় নজরুল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। খোঁজ করে মো. নজরুলকে পাওয়া গেল না। তবে স্থানীয় লোকজন বলেন, নজরুল ও তাঁর কয়েক ভাই এখানে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, নজরুলও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।
বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইব্রাহীম রিপন সাঁকো এন্টারপ্রাইজের নামে বেশ কয়েক বছর ধরে শ্মশানঘাটের ইজারা নিয়ে আসছেন। এখন এই কোম্পানির স্বত্বাধিকারী দেখানো হচ্ছে তাঁর ছোট ভাই ইকবাল আহমেদকে। প্রতিবছর ওই কোম্পানিকেই ইজারা দিতে হয়। এর বাইরে ইব্রাহীম রিপন নদী ভরাট করে বালু ও অন্য ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ইব্রাহীম রিপনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বালুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও অন্য কোনো ব্যবসা করছেন না। পরে তিনি বালুর ব্যবসার কথাও অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ছোট ভাইয়ের নামে ঘাট ইজারা নেওয়া হয়েছে।
টার্মিনাল হলে দখল ছেড়ে দেবেন কি না জানতে চাইলে ইব্রাহীম বলেন, ‘ঘাট ইজারা দিলে ঘাট নেব।’ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিলাম না। আমি সব সময়ই এমপি সানজিদা খানমের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি।’
এ বিষয়ে সাংসদ সানজিদা খানম বলেন, ‘রিপন আগে অন্য দলে ছিল কি না আমি জানি না, তবে আমি এমপি হওয়ার পর ওরা এই ঘাট বিআইডব্লিউটিএ থেকে ইজারা নেয়। ইজারার বাইরের জায়গায় তারা বালুর ব্যবসা করছে কি না, তা দেখা উচিত। কিন্তু রিপন যদি অন্যায়ভাবে কিছু করে থাকে, সেটা আপনারা দেখবেন। আমার এলাকা হিসেবে আমি এলাকার সবাইকেই চিনি। আমার মিটিং-মিছিলেও ওরা আসে।’
পোস্তগোলার শ্মশানঘাট এলাকায় দুই একর জায়গায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নৌ টার্মিনাল করার সিদ্ধান্ত হয় ২০১২ সালের মাঝামাঝি। কিন্তু জায়গা সম্পূর্ণ দখলমুক্ত না হওয়ায় এবং কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে আটকে আছে। গত জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে শ্মশানঘাট টার্মিনাল প্রকল্পের পরিচালক ও বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, একনেকে অনুমোদন হয়েছে, এখন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। জায়গা দখলমুক্ত করার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর বন্দর বিভাগের।
বন্দর বিভাগের হিসাব থেকে জানা যায়, শ্মশানঘাটের দক্ষিণে বিআইডব্লিউটিএ মার্কেটের অধীনে ৩২টি ট্রানজিট শেড (লোহা ও ইস্পাত কেনাবেচার ঘর) ছিল। প্রতি মাসে বর্গফুটের হিসাবে ৯ টাকা হারে প্রতি ঘর থেকে কমবেশি ১০ হাজার টাকা ভাড়া পেত বিআইডব্লিউটিএ। বছরে আয় হতো প্রায় সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, হাইকোর্টের নির্দেশের পর ২০১০ সালের মে মাসে প্রথম অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই আরও বড় পরিসরে অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট গড়ে ওঠে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় উচ্ছেদের দুই মাসের মধ্যেই আবার সব গড়ে ওঠে। সেই থেকে চলছে অবৈধ ব্যবসা।