নারী উন্নয়ন নীতি আসলে কবে হলো?

পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’। এতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রবর্তনের সালসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অসংগতি রয়েছে। ছবি: প্রথম আলো
পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’। এতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রবর্তনের সালসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অসংগতি রয়েছে। ছবি: প্রথম আলো

পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’-এ বলা হয়েছে, নির্যাতন দমনের জন্য ২০১২ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রবর্তন করা হয়েছে। তবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের করা নারী নীতির ভূমিকাতেই বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এবং নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার আসলে নীতিটি কবে প্রণয়ন করল? এ নীতির আসল উদ্দেশ্যই বা কী—শিক্ষার্থীরা কোন সালটি শিখবে?
পঞ্চম শ্রেণির এই বইয়ে ‘নারী-পুরুষ সমতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে নারী জাগরণের অগ্রদূত, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং নারী নির্যাতন নিয়ে আলাদা করে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন নিয়ে দেশে বেশ কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকার প্রথমে নারী নীতি প্রণয়ন করে। তবে ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট ওই নীতি গোপনে পরিবর্তন করে আমূল পাল্টে ফেলে। প্রণয়ন করে নারী নীতি ২০০৪। এ সময় নারী আন্দোলনের কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। পরে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংশোধিত আকারে প্রণীত হয় নারী নীতি ২০০৮। তবে তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর সরকার নারী নীতি ২০১১ প্রণয়ন করে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম প্রথম আলোকে বলেন, সমাজে এমনিতেই ইতিহাস বিকৃতি হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ে তথ্য সংযোজনের সময় যত্নবান হতে হবে। শিশুরা কোনোভাবেই যাতে ভুল তথ্য না পায়, সে দিকে নজর দিতে হবে।

নারী নির্যাতন বিষয়ে বলতে গিয়ে বইটির ৬৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন সম্পর্কে জানা যায়। বাংলাদেশের সরকার, এনজিও বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত নারী নির্যাতনের তথ্যের কথা উল্লেখ না করে হুট করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কথা বলা হয়েছে এখানে। এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছবি: প্রথম আলো
নারী নির্যাতন বিষয়ে বলতে গিয়ে বইটির ৬৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন সম্পর্কে জানা যায়। বাংলাদেশের সরকার, এনজিও বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত নারী নির্যাতনের তথ্যের কথা উল্লেখ না করে হুট করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কথা বলা হয়েছে এখানে। এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছবি: প্রথম আলো


নারী নির্যাতন বিষয়ে বলতে গিয়ে বইটির ৬৮ পৃষ্ঠায় বলেছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন সম্পর্কে জানা যায়। সরকার, এনজিও বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত নারী নির্যাতনের তথ্যের কথা উল্লেখ না করে হুট করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কথা বলা হয়েছে এ বইটিতে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে তথ্যগত ভুল এবং নারী নির্যাতনের তথ্যপ্রাপ্তিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কথা উল্লেখ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ে তথ্য দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারতেন। যা-ই হোক, বিষয়টি নজরে এল। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ধরনের অসংগতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্পর্কে কতটুকু জানা বা বোঝা সম্ভব বা এ তথ্য কেন পাঠ্যবইয়ে দিতে হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশ্চর্য! বাচ্চাদের পাঠ্যবইয়ে এ ধরনের তথ্য দেওয়া আছে?’ তিনি বলেন, পাঠ্যবইতে কোনো কিছু অন্তর্ভুক্ত করার আগে তা ওই বয়সী বাচ্চার জন্য উপযোগী কি না, বেড়ে ওঠার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না—তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতির বিষয় ও তথ্যের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শুধু পঞ্চম শ্রেণির এই বইটিতেই নয়, পাঠ্যবইয়ে ভুল নিয়ে আরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাঠ্যবই পরিমার্জনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তার পরও ভুল থেকে যাচ্ছে, যা দুঃখজনক।
সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করে। এ মন্ত্রণালয় নিপীড়নের শিকার নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ সেবা দিচ্ছে বলেও উল্লেখ আছে। তার পরেই নারী নির্যাতন বিষয়ে এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। অথচ শিশু একাডেমি নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করে না, এ সংস্থা শিশুর মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে, নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করা মন্ত্রণালয়ের আরেক সংস্থা জাতীয় মহিলা সংস্থা সম্পর্কে কিছু বলাই হয়নি।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইনামুল হক সিদ্দিকী ব্যক্তিগতভাবে পাঠ্যপুস্তকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ তথ্য পড়তে না হয় বা পড়াশোনায় যাতে তাদের বিঘ্ন না ঘটে তা দেখা হবে। প্রয়োজনে গণমাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিভিন্ন ভুল ও ত্রুটি সংশোধন করা হবে।’