নারীদের পছন্দ থ্রি-পিস পুরুষের পাঞ্জাবি-শার্ট

কুষ্টিয়ার বাজারে এবার শাড়ি বিক্রি কমেছে। তারপরও পরিবারের সদস্যদের জন্য দু–একটা শাড়ি কিনছেন কেউ কেউ। ছবিটি গতকাল শহরের লাভলী টাওয়ার শপিংমল থেকে তোলা l প্রথম আলো
কুষ্টিয়ার বাজারে এবার শাড়ি বিক্রি কমেছে। তারপরও পরিবারের সদস্যদের জন্য দু–একটা শাড়ি কিনছেন কেউ কেউ। ছবিটি গতকাল শহরের লাভলী টাওয়ার শপিংমল থেকে তোলা l প্রথম আলো

হৃদিতা, রাইসা ও তাসনিম (ছদ্দ নাম)। ওরা তিন বোন। বড় বোন বিশ্ববিদ্যালয় আর ছোট দুই বোন কলেজে পড়ে। সকাল দশটা থেকে কুষ্টিয়া শহরে নতুন গড়ে ওঠা বহুতলবিশিষ্ট বিপণিবিতান পরিমল টাওয়ারের এক পাশ থেকে আরেক পাশ ঘুরছেন। উদ্দেশ্য এই ঈদে মনের মতো একটা গাউন পোশাক কেনা। এক দোকানে পেয়েও গেলেন কিন্তু তিনটা গাউন একসঙ্গে মেলাতে পারলেন না। নিরুপায় হয়ে আবার ছুটলেন অন্য দোকানে।

যাওয়ার আগে কথা হলো তাঁদের সঙ্গে। গাউন পোশাকের প্রতি কেন এমন ঝোঁক? এমন প্রশ্ন শুনতেই একটু তেতে গেলেন হৃদিতা। তাঁর মতে, হোক সেটা বিদেশি ধাঁচ তাতে কি এই পোশাকের একটা মাধুর্য আছে। দাম যাই-হোক সবাই কিনছে এ জন্য তাঁদেরও দরকার।

এই তিন বোন ও আরও কয়েকজন নারীর কথায় একই সুর পাওয়া গেল। এবার সবার পছন্দ গাউন ও বাহুবলীর পোশাক। এতে জমে উঠেছে কুষ্টিয়ার ঈদের বাজার। রমজানের প্রথম দিন থেকেই বাজারে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবদি চলছে কেনাবেচা।

কেনাকাটায় কমতি নেই ছেলেদেরও। চাহিদা অনুযায়ী পাঞ্জাবি-পাজামা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট বেশি চলছে। কুষ্টিয়ায় এবার ঈদে রিচম্যান, বন্ড ও দর্জিবাড়ি নামে ব্রান্ডের তিনটি শোরুম উদ্বোধন হয়েছে। নিজস্ব বাহারি পোশাক পাওয়া যাচ্ছে সেখানে।

রিচম্যানের বিক্রয় কর্মী আসাদুল ইসলাম বলেন, ব্রান্ডের পাঞ্জাবি-পাজামা ও শার্ট কিনতে পুরুষদের আগ্রহ অনেক। বেচাবিক্রিতেও তাঁরা খুশি। পছন্দ হলেই কিনে নিচ্ছেন। দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচ শ টাকার মধ্যে পোশাকের চাহিদা বেশি।

দর্জিবাড়ির ইনচার্জ সুমন সিদ্দিকী জানালেন, মাত্র দশ দিন শোরুম উদ্বোধন হয়েছে। বেশ সাড়া পড়েছে। এ জেলায় ব্রান্ডের পোশাকের বেশ চাহিদা আছে। পছন্দ হলেই একাধিক পোশাক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তবে পাঞ্জাবির ক্রেতা বেশি।

ফিরে যাই পরিমল টাওয়ারে। সেখানে তিনতলার প্রতিটা ফ্লোরে সকাল এগারোটার মধ্যে কেনাকাটার ধুম পড়ে গেল। মেয়েদের জন্য থ্রি-পিস, ফ্রগ, স্কার্ট এবং শিশুদের শার্ট, প্যান্টসহ নানা নজরকাড়া পোশাক পাওয়া যাচ্ছে।

রুপ রচনা শাড়ীজের বিক্রয়কর্মী বিজয় কুমার জানালেন, তাঁদের দোকানে শুধুই শাড়ি বিক্রি হতো। তবে শাড়ি বিক্রিতে ধস নেমেছে। এ জন্য থ্রি-পিস তুলেছেন। এই ঈদে ব্যাপক থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে।

পাশেই থ্রি-পিস চয়েজ নামে দোকানে দেখা গেল বাহারি পোশাক। দোকানের স্বত্বাধিকারী জহুরুল ইসলাম বললেন, দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে থ্রি-পিসের ক্রেতা বেশি। পছন্দ হলেই একাধিক পোশাক কিনে নিচ্ছেন। তবে সেই তুলনায় এবার বাজারে ভালো নকশার কোনো থ্রি-পিস আসছে না।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রি একই রকম আছে। দেশের তৈরি পোশাকেরও চাহিদা বেশি। তবে বিদেশি ডাবিং সিরিয়াল, ভারতীয় সিনেমা ও ধারাবাহিক নাটকের জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের নামে দেশে তৈরি পোশাকের প্রতি তরুণ-তরুণীদের আকর্ষণ বেশি।

সরেজমিনে গত রোববার শহরের এনএসরোডের দুই পাশের শতাধিক দোকান, বঙ্গবন্ধু মার্কেট, পরিমল টাওয়ার, লাবলী টাওয়ার, রজব আলী মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা হয়। প্রতিটা মার্কেটেই জমে উঠেছে ঈদের বাজার।

কয়েকজন ক্রেতা-বিক্রেতা বলেন, সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কেনাবেচা চলছে। শিশু ও তরুণীদের জন্য ফ্রক, গাউন, জিপসি, লাচা জামা বেশি বিক্রি হচ্ছে। সব বয়সীদের জন্য এই পোশাকগুলো দুই হাজার থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকার বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।

কয়েক দশক ধরে শহরে দেশীয় বিভিন্ন ধরনের শাড়ি বিক্রি করে আসছেন আছাদুর রহমান বাবু। তিনি জানালেন, শাড়ি বিক্রি মৃতপ্রায়। কোনো ক্রেতা নেই। সবাই ঝুঁকছে থ্রি-পিসের দিকে। হাতেগোনা কয়েকজন শাড়ি কিনছেন।

জামাল খান নামে এক ক্রেতা বললেন, পরিমল টাওয়ারে পোশাকের দামের পার্থক্যটা খুব একটা বেশি না। রুচিশীল পোশাক এখানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।

মাহের মোহাম্মদ নাঈম জানালেন, ব্রান্ডের পণ্যের দাম বেশি তবে সেগুলা বাহারি ডিজাইন ও পোশাকগুলা মানানসই হওয়ায় ছেলেরা অধিক দাম দিয়ে হলেও ব্রান্ডের পোশাক কিনছে।

তবে মাহেরের বিপক্ষেও আছেন কয়েকজন। ব্র্যান্ডের শার্ট-প্যান্ট কিনতে গেলে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে বললেন রাকিব রহমান।

কিবরিয়া মাছুমের ভাষায় বাহুতে যাঁদের জোর বেশি তাঁরাই বাহুবলী পোশাক কিনছে। সব মিলিয়ে ঈদের বাজারে দামের ঠেলাঠেলি ও ভিড় বেশ জমে উঠেছে।

কুষ্টিয়া নিডস টেইলার্সের মালিক কাদেরী শাকিল বলছেন, শহরে কয়েকটি ব্রান্ডের শোরুম হওয়ায় কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরিতে একটু ছেদ পড়েছে। তবে পনেরো রমজান থেকে টেইলার্সের ফরমাশ নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।