নির্বাচনের বছরে ভোটারদের খুশি করতে আরও প্রকল্প

>• প্রকল্পটির নাম গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)।
• প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প।
• প্রকল্পে ২৮১টি পৌরসভার সড়ক ও নালা নির্মাণ করা হবে।
• একেকটি পৌরসভা বরাদ্দ পাবে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা।
• বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের বছরে এই প্রকল্প ভোটারদের খুশি করার জন্য।


প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হতে বাকি আছে আট মাস। কিন্তু তার আগেই প্রায় তিন গুণ ব্যয় বাড়িয়ে শুরু হয়েছে একই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। এর অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই দেশের ২৮১টি পৌরসভার একেকটি ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের বছরে এমন প্রকল্প ভোটারদের খুশি করার জন্য। পৌর মেয়রদের ওপর স্থানীয় সাংসদদের প্রভাব থাকায় জাতীয় নির্বাচনে এই প্রকল্প বিশেষ সুবিধা দেবে।

প্রকল্পটির নাম গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)। পৌরসভার সড়ক ও নালা নির্মাণে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ রয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। গত সপ্তাহে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হয়েছে। অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের বছরে সাংসদদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সাংসদের ইচ্ছায় নিজের সংসদীয় এলাকায় স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণের জন্য চলতি অর্থবছরেই তিনটি প্রকল্প পাস করা হয়েছে। আরও তিনটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়াদ শেষের আগে পরের পর্যায়ের কাজ শুরু এটা উচিত না। ভোটারদের খুশি করার জন্য শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে এমন উদ্দেশ্যমূলক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এমন প্রকল্পে নির্বাচনে সুবিধা হবে, কিন্তু তাতে দোষের কিছু নেই। নির্বাচনে সুবিধা হবে বলে কি উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকবে? পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্পে আরও কাজ করার সুযোগ ছিল। তাই সম্প্রসারণ করা হয়েছে।’

গত ৮ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পৌরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়) অনুমোদন দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত এ প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

এলজিইডির নগর ব্যবস্থাপনা ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভাগুলো নিজের আয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হিমশিম খায়। পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব। পৌরসভার বাসিন্দাদের নাগরিক সুবিধা বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়নে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। যদিও পৌরসভাগুলোর চাহিদার তুলনায় এই প্রকল্পে বরাদ্দ কম।

সড়ক ও নালা নির্মাণের মাধ্যমে পৌরসভাগুলোর অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়াতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৬১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৪ হাজার ২০০ মিটার সেতু-কালভার্ট নির্মাণ এবং ২৮১ কিলোমিটার নালা নির্মাণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পে চলতি বছরে ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে যাবে, সড়ক ও নালার নির্মাণকাজও শুরু হয়ে যাবে।

এলজিইডির একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ থাকার পরেও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে মূলত আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে। নির্বাচনের আগে প্রকল্পের বড় অর্থ ছাড় করা হবে। পৌর মেয়রেরা সড়ক ও নালা নির্মাণের প্রস্তাব পাঠালেও এর সুবিধা পাবেন ওই এলাকার সাংসদেরা।

এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বড় শহরগুলোর জনসংখ্যার চাপ কমানো ও পৌরসভাগুলোতে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২০১১ সালে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন নামের একটি প্রকল্প নেয় সরকার। প্রথম পর্যায় হিসেবে পরিচিত প্রকল্পটির আওতায় ২৬৬টি পৌরসভা রয়েছে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রাক্কলিত খরচ ১ হাজার ২৫৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচনের বছরে এমন জনতুষ্টির প্রকল্পের হিড়িক পড়ে যায়। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এমন প্রকল্প নেওয়া হতে পারে, তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এসব প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।