ঈশা খাঁ ঘাঁটিতে বোমা হামলা মামলায় অভিযোগপত্র
নৌবাহিনীর ঘাঁটি থেকে অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা ছিল জেএমবির
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে নৌবাহিনীর শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটি থেকে অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা ছিল জেএমবির। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঈশা খাঁ ঘাঁটির সুরক্ষিত এলাকার দুটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা করেন নিষিদ্ধঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংঘটিত ওই হামলার ২২ মাস পর নৌবাহিনীর সাবেক এক সদস্যসহ পাঁচজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
সেদিন দুটি মসজিদে বোমা হামলায় নৌবাহিনীর কর্মকর্তাসহ ২৪ জন মুসল্লি আহত হন। ঘটনার পরপরই ঈশা খাঁ ঘাঁটির সব গেট বন্ধ করে তল্লাশি চালানো হয়। একটি ব্যারাকের নিচতলার শৌচাগারে পরিত্যক্ত অবস্থায় অবিস্ফোরিত বোমা এবং একটি সুইসাইড ভেস্ট (আত্মঘাতী হামলার জন্য বিস্ফোরকপূর্ণ বন্ধনী) পাওয়া যায়।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরের ইপিজেড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ ওসমান গণি। হামলার ওই ঘটনায় একটি মামলা হলে আইনের দুটি ধারায় (সন্ত্রাসবিরোধী এবং বিস্ফোরক) পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দেন তিনি।
দুটি অভিযোগপত্রে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য এম সাখাওয়াত হোসেন (হামলার সময় প্রেষণে র্যাবে কর্মরত ছিলেন, ঘটনার পরপরই পালিয়ে যান), ঈশা খাঁ ঘাঁটির বলকিপার আবদুল মান্নান, রমজান আলী ও বাবলু রহমান ওরফে রনি এবং মান্নানের বড় ভাই আবদুল গাফফার। তাঁদের মধে৵ সাখাওয়াত ও বাবলু পলাতক। বাকি তিনজন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, জেএমবির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিকল্পনায় সংগঠনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিন ওরফে নাফিসের (বোমা বিস্ফোরণে নিহত) নেতৃত্বে ঈশা খাঁ ঘাঁটিতে হামলা হয়। ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল বগুড়ার শেরপুরের একটি মেসে গ্রেনেড তৈরি করতে গিয়ে নিহত হন তিনি। যে কারণে এজাহারে আসামি হিসেবে ফারদিনের নাম থাকলেও অভিযোগপত্র থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়।
২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঈশা খাঁ ঘাঁটির ভেতরে পতেঙ্গা মসজিদে জুমার নামাজের সময় আসামি আবদুল মান্নান মুসল্লিদের ওপর পরপর দুটি বোমা (গ্রেনেড) নিক্ষেপ করেন। ভীতসন্ত্রস্ত মুসল্লিরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করলে হামলাকারী মান্নান ভিড়ের সঙ্গে মিশে যান। কিন্তু তাঁর বাঁ হাতের কবজিতে ইলেকট্রিক সুইচ দেখা যাওয়ায় মুসল্লিরা তাঁকে ধরে ফেলেন। তিনি তখন আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।
পতেঙ্গা মসজিদে হামলার ১০ মিনিট পর সেদিন বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে ঈশা খাঁ ঘাঁটির আরেকটি মসজিদেও আরেকটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই মসজিদে জুমার নামাজ শুরু হলে আসামি রমজান আলী জামাতের প্রায় মাঝ বরাবর দুটি বোমা (গ্রেনেড) নিক্ষেপ করে মুসল্লিদের মধ্যে মিশে যান। পরে তাঁকেও ধরে ফেলা হয়।
মামলা
হামলার নয় মাস পর নৌবাহিনীর নেভাল প্রভোস্ট মার্শাল কমান্ডার এম আবু সাঈদ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী ও বিস্ফোরক আইনে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানায় মামলা করেন। মামলাটি চার পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত করেন।
চার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছেন, দেশের প্রচলিত আইন তাঁরা মানেন না। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য সাখাওয়াত হোসেনের মাধ্যমে কাপ্তাইয়ে শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটিতে মান্নান ও রমজান ক্যানটিন বয় হিসেবে কাজ নেন। রমজান টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পাস করলেও অষ্টম শ্রেণি পাস দেখিয়ে এই কাজ নেন।
মান্নান, রমজান ও বাবলু পরিচয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা গোপন করে ২০১২-১৩ সালে অস্থায়ী বেসামরিক কর্মচারী (ক্যানটিন বয়, ব্যাটম্যান, বলকিপার) হিসেবে কাপ্তাই বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটিতে কাজ নেন। জেএমবি চট্টগ্রামের প্রধান ফারদিনের পরামর্শে তাঁরা এই কাজ করেন। শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটিতে বাবলুর কাছে চেয়ারম্যান সনদ চাওয়া হলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভয়ে তিনি ঘাঁটি ত্যাগ করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, হামলার আগের দিন ফারদিন ব্যাগে করে পাইপবোমা এবং গ্রেনেড মান্নান ও রমজানকে হস্তান্তর করেন। তাঁরা ঘাঁটিতে নিজেদের কক্ষে তা জমা রাখেন।
অভিযোগপত্র দুটি গ্রহণের শুনানির জন্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে বলে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী।