পরীমনির রিমান্ড বিষয়ে দুই বিচারকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন হাইকোর্ট
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুরের কারণ উল্লেখ করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস ও আতিকুল ইসলামের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ‘ত্রুটি হয়েছে যে তা ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বাস করেন না। হাইকোর্টকে আন্ডারমাইন করা হয়েছে।’
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে বিচারকদের লিখিত ব্যাখ্যা গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জমা দেওয়া হয়। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আজ বুধবার লিখিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। শুনানি নিয়ে আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশের জন্য দিন রেখেছেন।
গত ৪ আগস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাঁর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা হয়। এ মামলায় পরীমনিকে প্রথমে চার দিন, দ্বিতীয় দফায় দুদিন, তৃতীয় দফায় এক দিনসহ মোট সাত দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিফল হয়ে জজ আদালতে জামিন চান পরীমনি। তবে জজ আদালত জামিন আবেদনের শুনানির তারিখ দেরিতে নির্ধারণ করায় হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি। হাইকোর্ট রুল দেন। পরে জজ আদালত পরীমনির জামিন আবেদনের ওপর শুনানির তারিখ এগিয়ে আনেন। ৩১ আগস্ট তাঁকে জামিন দেওয়া হয়। পরদিন পরীমনি কারামুক্তি পান।
অন্যদিকে, হাইকোর্টে পরীমনির আবেদনের শুনানিতে তাঁকে দফায় দফায় রিমান্ড নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ওই দুই বিচারককে ব্যাখ্যা দিতে এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তাফাকে নিজের অবস্থান ও কারণ ব্যাখ্যা করতে ১৫ সেপ্টেম্বর (আজ) আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় দুই বিচারকের ব্যাখ্যা আদালতে দাখিল করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাও আদালতে উপস্থিত হন।
মামলায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস দ্বিতীয় দফায় পরীমনির দুদিন এবং ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম তৃতীয় দফায় এক দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
সূত্রের তথ্যমতে, রিমান্ড মঞ্জুরের কারণ তুলে ধরার পাশাপাশি পৃথক লিখিত ব্যাখ্যায় দুই ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশে ত্রুটি–বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত ও সরল বিশ্বাসে বলে উল্লেখ করেছেন। আর অনিচ্ছাকৃত ও সরল বিশ্বাসে করা ভুলত্রুটি মার্জনা করে পৃথক ব্যাখ্যা গ্রহণ করে অধিক ব্যাখ্যার দায় থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার আরজিও জানিয়েছেন দুই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টকে শিক্ষা দিয়েছেন
আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে ক্রম অনুসারে বিষয়টি উঠলে হাইকোর্ট বলেন, ‘দুজন ম্যাজিস্ট্রেটকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছিল। তাঁরা উত্তর দিয়েছেন। অংশবিশেষ পড়ে শোনাতে চাই।’
এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবু ইয়াহিয়া দুলাল বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে আসতে বলা হয়েছিল।
আদালত বলেন, ‘তিনি এসেছেন, দেখেছি। তিনি আছেন।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য ও আইনজীবী জেড আই খান পান্নার উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘লার্নেড ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টকে শিক্ষা দিয়েছেন কিছু। এই অংশটুকু পড়ছি। রাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এই মামলার আসামি পরীমনি বিদেশি মদ, এলএসডি, আইসসহ গ্রেপ্তার হন। প্রশ্ন হচ্ছে, এলএসডি ও বিদেশি মদ পেলে শাস্তি কী?’
তখন জেড আই খান পান্না বলেন, ‘পাঁচ বছর হতে পারে।’
আদালত বলেন, ‘এটি পরিষ্কার করতে হবে। যে পরিমাণ এলএসডি ও আইস পাওয়া গেছে, তাতে শাস্তির পরিমাণ কত?’
তখন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইয়াবা বড়ির ক্ষেত্রে যে সাজা, এলএসডির ক্ষেত্রেও তা–ই হবে।’
আদালত বলেন, ‘তাহলে দুই থেকে পাঁচ বছর হতে পারে।’ জেড আই খান পান্না বলেন, ‘পাঁচ বছর হবে, মাই লর্ড।’
বিচারকের লিখিত ব্যাখ্যা তুলে ধরে আদালত বলেন, ‘এলএসডি মাদক যে কত ভয়ানক, তা পুরো দেশবাসী অবগত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। এলএসডিকে ভ্রম উৎপাদক মাদক হিসেবেও বলা হয়। ওই ছাত্র এলএসডি গ্রহণের পর একজন ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে ছুরি নিয়ে নিজের গলায় পোঁচ মেরে আত্মহননের পথ বেছে নেন।’
আদালত বলেন, ‘আমরা তাঁদের (বিচারক) কারণ দর্শাতে বলেছি, কেন দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে? এখানে তাঁরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এলএসডি গ্রহণের পর একজন ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে ছুরি নিয়ে নিজের গলায় পোঁচ মেরেছেন। এখানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা ও প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে তিনি (বিচারক)। এ কারণে তাঁদের জবাবে আমরা সন্তুষ্ট নই। এ জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশের জন্য রাখছি।’
আদালত বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সিডি উপস্থাপন করেছেন। ২৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশের জন্য রাখা হচ্ছে। ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তাকে আসতে হবে। এ সময় আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘বিচারকদের ব্যাখ্যার কপি পেতে পারি?’
আদালত বলেন, ‘বিষয়টি বিচারাধীন। তাই অংশবিশেষ পড়ে শোনানো হলো। আরেকটু পড়ছি।’
আদালত বলেন, ‘উপযুক্ত বিষয়ে সার্বিক বিবেচনায় আমি (মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস) দুই দিন রিমান্ড মঞ্জুর করার আদেশ প্রদান করি। ওই আদেশ প্রদানে কোনোরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতি নিতান্তই আমার অনিচ্ছাকৃত এবং সরল বিশ্বাসে করা ভুল।’
ত্রুটি হয়েছে যে তা তাঁরা (বিচারক) বিশ্বাস করেন না উল্লেখ করে আদালত বলেন, ‘হাইকোর্টকে আন্ডারমাইন করা হয়েছে।’
তখন জেড আই খান পান্না বলেন, ‘একদম ঠিক, যদি ভুল হয়ে থাকে।’
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘২৯ সেপ্টেম্বর তারিখ রাখা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায় কি না?’
আদালত বলেন, ‘ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তাকে আসতে হবে। তাঁর ব্যাখ্যার দরকার আছে। তাঁকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। যেকোনো আইনজীবীর মাধ্যমে বা তিনি নিজেও ব্যাখ্যা দিতে পারেন।’