পুরোনো বিশৃঙ্খলায় সড়ক, ঝরছে রক্ত

সড়কে বিশৃঙ্খলা এড়াতে নানা কর্মসূচির পরও নিয়ম না মেনে সড়কের মধ্যে বাস থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো চলছে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায়।  ছবি: প্রথম আলো
সড়কে বিশৃঙ্খলা এড়াতে নানা কর্মসূচির পরও নিয়ম না মেনে সড়কের মধ্যে বাস থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো চলছে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো
>

• নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলেছেন সবাই
• বেপরোয়া চালকেরা, পিষ্ট মানুষ

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী ইপিজেডের ভেতর নিজের কর্মস্থলের সামনেই গত ২৯ ডিসেম্বর বাসচাপায় নিহত হয়েছিলেন তিনজন। দুর্ঘটনায় নিহত কেইপিজেডের কর্মকর্তা আবদুল লতিফের থেঁতলে যাওয়া শরীরটা দ্রুততম সময়ে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করার চেষ্টাতেই ছিলেন তাঁর ছেলে মামুনুর রশীদ। বাবার এ রকম একটা ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে মাথায় আর অন্য কিছুই কাজ করছিল না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রলীগের নেতা মামুনের। যাওয়ার আগে কেবল পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর বাবার দাফনের আগেই যেন ঘাতক বাসচালক গ্রেপ্তার হন। এক সপ্তাহ হতে চলল। ওই ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি, পুলিশও কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

এর মধ্যেই দেশের রাস্তায় ঝরে গেছে অনেক রক্ত। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার, নতুন বছরের প্রথম দিনে রাজধানীর সড়কে বাসচাপায় দুই তরুণী নিহত হওয়ার পর পুলিশ জানল বাসচালকের কোনো লাইসেন্সই নেই। অথচ মো. জুনায়েদ নামের ওই বাসচালক আরেকটি বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে দিনের পর দিন গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় বাসচাপায় দুই কলেজশিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহের প্রায় পুরোটাই ঢাকার সড়কগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের দখলে। সরকারদলীয় লোকজনের লাঠিপেটা আর মামলার মুখে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ক্ষান্ত দেয়। তবে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রীরা বিভিন্ন সময় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে সড়কে যান চলাচল ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোও নিজেদের ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা বলেছিল। তবে বছর শেষে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নির্বাচনের ডামাডোলে ব্যস্ত পুলিশ সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিই ভুলতে বসেছে।

লাইসেন্স নেই বাসচালকের
দুই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর আগস্টে শুরু হওয়া নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে চলাচলরত সব ধরনের যানবাহনের চালককে লাইসেন্স দেখাতে বাধ্য করে। তারা লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে পুলিশকেও। ওই ঘটনার পরম্পরায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকেও বারবার লাইসেন্স ছাড়া কাউকে চালক না রাখতে বলা হয়েছিল। লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে কয়েক দিন পুলিশকে বেশ তৎপরও দেখা গিয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি আবার আগের মতোই।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মালিবাগে বাসচাপায় নিহত হন পোশাকশ্রমিক নাহিদ পারভীন পলি (২১) ও তাঁর বান্ধবী মিম আক্তার (১৫)। ঘটনার প্রতিবাদে ওই সড়কে ব্যাপক ভাঙচুর করে আটকে রাখেন শ্রমিকেরা, দুটি বাসে আগুনও দেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দুই তরুণী রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময়ই সুপ্রভাত ও তুরাগ পরিবহনের দুটি বাস আগে যাওয়ার পাল্লা দিয়ে মালিবাগ ফ্লাইওভার থেকে নামছিল। দুর্ঘটনার পর পুলিশ সুপ্রভাত পরিবহন বাসের চালক মো. জুনায়েদকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ এনে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন নিহত মিমের মা জরিনা বেগম।

হাতিরঝিল থানার ওসি আবু মো. ফজলুল করিম বলেন, চালক জুনায়েদ কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। তাঁর শিক্ষানবিশ লাইসেন্স রয়েছে বলে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন।
পুলিশ ও বিআরটিএর কর্মকর্তা বলেছেন, সড়কে গাড়ি চালানোর জন্য শিক্ষানবিশ লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এই লাইসেন্স নিয়ে কেউ বাসের মতো গণপরিবহন চালানোর কথা নয়।

তিনজনের মৃত্যুর পরও...
গত ২৯ ডিসেম্বর সকালে যখন শ্রমিকেরা কেইপিজেডের নিজ নিজ কারখানায় ঢুকছিলেন, তখনই একটি কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সারি বাসকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় নিয়ন্ত্রণ হারানো দ্রুতগতির একটি বাস। ধাক্কা খেয়ে প্রথম বাসটি সামনের আরেকটি বাসকে ধাক্কা দেয়। ইপিজেডের ভেতরে ইয়ংওয়ানের একটি কারখানায় ঢোকার জন্য সেদিক দিয়ে শ্রমিকেরা যাচ্ছিলেন। তিন বাসের মধ্যে পড়ে হতাহত হন বেশ কয়েকজন। শেষ পর্যন্ত তিনজন মারা যান। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আবদুল লতিফ, রাজিয়া সুলতানা ও মো. ইকবাল।

নিহত আবদুর লতিফের ছেলে মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে যান। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার কর্ণফুলী থানা থেকে তাঁকে ফোন করে মামলা করবেন কি না, সেটা জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমি তো তখন দিশেহারা। পুলিশকে বললাম, ভাই, আমাদের চাওয়ার কিছু নেই, খালি আমার বাবাকে কবরে শোয়ানোর আগে ওই ড্রাইভাররে ধরেন। আমরা চলে আসলাম। এখন পুলিশ জানতে চাচ্ছে মামলা করব কি না।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সহসম্পাদক মামুন বলেন, ৬ জানুয়ারি থেকে তাঁর স্নাতক চূড়ান্ত সেমিস্টারের পরীক্ষা। এখনো তিনি পরিবারের সঙ্গে টাঙ্গাইলেই রয়েছেন। দিশেহারা অবস্থা পুরো পরিবারটির।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর মাহমুদ বলেন, ওই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ একটি এজাহার দিয়েছে। এখন হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের কেউ মামলার বাদী হবেন, নাকি কেইপিজেড, সেই সিদ্ধান্ত আজ (বৃহস্পতিবার) হবে।

ফিরেছে পুরোনো ব্যবস্থা
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাজধানীর সড়কে চলা অনিয়ম তাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। গত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে ট্রাফিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। কিন্তু মাসের শেষে তিনিই ‘কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফলতা’ আসেনি বলে স্বীকার করেন। এরপর নির্বাচনের কারণে পুলিশের তৎপরতাও কমে যায়।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক বাস ও লেগুনামালিক, চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগস্টের আন্দোলনের পর পুলিশ গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স ও ফিটনেস পরীক্ষা করেছে, মামলাও হয়েছে প্রচুর। কিন্তু দুই মাস পরই তাঁরা আবার আগের ব্যবস্থায় ফিরে গেছেন। পুরোনো সেই ব্যবস্থার নাম ‘মানতি’। অর্থাৎ পুলিশের কোনো একজন বা একদল কর্মকর্তার সঙ্গে মাসভিত্তিক টাকার বিনিময়ে একটা অলিখিত ছাড়পত্র নেওয়া। সেই গাড়িটি কোন কোন সড়কে চললে সেই মানতির আওতায় থাকবে, তা-ও বলে দেওয়া হয়। ওই সব সড়কে কোনো পুলিশ গাড়িটি আটকালে চালক ফোনে সেই ‘মানতি’ করা কর্মকর্তার কাছে ফোন করে ফোনটি ধরিয়ে দেন গাড়ি আটকানো কর্মকর্তাকে। এভাবেই চলছে এখন।

একজন লেগুনামালিক গতকাল বলেন, আগস্টের ‘ওই ঝামেলার’ পর তিনি নিজেই গাড়ি চালানো শুরু করেন। এখন আবার অন্যদের কাছে লেগুনা দৈনিক জমার ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে দোকান করছেন। তিনি বলেন, ‘ছোট গাড়ির ছোট ড্রাইভার, মানতি করা থাকলি পরে কুনো সমস্যা নাই।’

লেগুনামালিকেরা বলছেন, আবারও শিশু-কিশোর চালকেরা তাঁদের গাড়িগুলো চালাচ্ছেন। গাড়ির সব ঠিক থাকলেও মামলা হয় যদি মানতি করা না থাকে। আর মানতি করা থাকলে বাতিল গাড়িও রাস্তায় চালাতে পারেন তাঁরা। চালকের লাইসেন্স আছে কি না, সেই বালাইও থাকে না। বেশির ভাগ লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে এই বিষয়গুলো সামলানো হয়।

কারওয়ান বাজারের একজন মিনিট্রাকচালক বলেন, ‘পুলিশরে ট্যাকা না দিয়া কেউ ঢাকা শহরো গাড়ি (ট্রাক) চালাইতে পারে না। ট্যাকা দিলে সব ঠিক, না থাকলে নতুন গাড়িতেও মামলা।’ তিনি বলেন, পরিবহন ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ঝামেলা হোক, এটা চান না বলে টাকা দিয়েই সমাধান খোঁজেন।

পুলিশের ওয়েব পোর্টাল ডিএমপি নিউজে দেখা যায়, ঢাকার পুলিশ প্রতিদিন গড়ে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে চার হাজার মামলা করছে। এর অর্ধেকর বেশি মোটরসাইকেল, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি।