
ভ্যানচালক মো. সেলিম প্রসূতি স্ত্রীকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে জানলেন, স্বাভাবিক প্রসবে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাগবে। পরে যান মিরপুরের ওজিএসবি হাসপাতালে। গত ১০ মার্চ সেখানে তাঁর স্ত্রীর ছেলেসন্তান হয়। অসচ্ছল বলে কর্তৃপক্ষ ওষুধের দাম ছাড়া কোনো ফি রাখেনি তাঁর কাছ থেকে।
সেলিমের মতো এমন বহু অসহায় মানুষের সহায় রাজধানীর মিরপুরের এই হাসপাতালটি। পুরো নাম অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ হাসপাতাল (ওজিএসবি)। মিরপুর-১৩তে এক একর জায়গার ওপর হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। এখানে নরমাল ডেলিভারি (স্বাভাবিক প্রসব), সিজারিয়ান ডেলিভারিসহ সব ধরনের গাইনোকোলজিক্যাল অস্ত্রোপচার করা হয় নামমাত্র মূল্যে। তবে অসহায় ও অসচ্ছল প্রসূতিদের সেবা দেওয়া হয় বিনা মূল্যে।
সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালটি খুব ভালো। বাড়তি কুনো টেকা নেয় নাই। ১ হাজার ৮০০ টেকা খরচ হইছে। অন্য হাসপাতালে গেলে তো অনেক টেকা লাগত। বাচ্চা হওয়ার পরও তারা খোঁজখবর নেয়।’
বেসরকারি হাসপাতাল হলেও মিরপুর ও আশপাশের এলাকার প্রসূতিদের জন্য এই হাসপাতাল এক আস্থার জায়গা। পাশাপাশি কিশোরী, নবজাতকদের স্বাস্থ্যসেবা, গাইনি অস্ত্রোপচার, নারীদের জরায়ু ক্যানসারসহ বিনা মূল্যে বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সিরাজুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর একটা লক্ষ্য থাকে ব্যবসা করে টাকা উপার্জন করা। হাসপাতালে গেলেই টাকা খরচ হবে। মানুষের এমন বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁদের এমন উদ্যোগ। তবে প্রচারণা নেই বলে তাঁদের এখানে অনেক রোগী আসে না।
হাসপাতালটি পরিচালনা করে ওজিএসবি সমিতি। ১৯৭২ সালে প্রজননস্বাস্থ্য খাতে সেবা দিতে এই সমিতির প্রতিষ্ঠা। ১৯৯৫ সালে এই সমিতি মিরপুর-১-এ প্রথম হাসপাতাল করে। সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষকে অল্প পয়সায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সমিতির সদস্যরা ভাবলেন বড় আকারে একটা হাসপাতাল করার। সদস্যদের অনুদানের ৬ কোটি এবং সরকারের পক্ষ থেকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হয় ওজিএসবি হাসপাতালের কার্যক্রম। ২০১১ সাল থেকে চিকিৎসাসেবা শুরু হয়। পাঁচতলাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে ১৫০ শয্যা আছে।
হাসপাতাল থেকে উপার্জিত আয়ের কোনো অর্থ নেয় না সমিতি। বরং নানাভাবে সমিতি অনুদান দেয় এবং সদস্যরা হাসপাতালে এসে বিনা মূল্যে রোগী দেখেন। বর্তমানে এই সমিতির সদস্যসংখ্যা ১ হাজার ৮০০। গত ২৪ মার্চ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশ ফটক পেরোলেই অভ্যর্থনাকেন্দ্র। এর বাঁ পাশে ওষুধের দোকান। ওয়ার্ডগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন। যদিও হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা খুবই কম। সচ্ছল কেউ চাইলে স্বল্প টাকায় এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন। আছে কেবিন-সুবিধাও।
হাসপাতালের তিন মাসের রোগী নিবন্ধন খাতা ঘেঁটে দেখা যায়, হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে দিনে গড়ে ৫০-৬০ জন চিকিৎসাসেবা নিয়েছে।
বিনা মূল্যে যত সেবা
প্রতি মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার এই হাসপাতালে বিনা মূল্যে রোগী দেখা হয়। আর প্রতি বৃহস্পতিবার নারীদের স্তন ক্যানসার শনাক্তের পরীক্ষা, জরায়ুমুখ ক্যানসারের কলোকোসকপি পরীক্ষা, ভিআইএ, প্যাপস পরীক্ষাও বিনা মূল্যে করানো হয়।