ফারাজ বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে

ফারাজ আইয়াজ হোসেন
ফারাজ আইয়াজ হোসেন

গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলায় নিরীহ মানুষদের মর্মস্পর্শী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ফারাজের নাম। কারণ ফারাজ আইয়াজ হোসেন নামটির পেছনে আছে অনন্য আত্মত্যাগের কাহিনি। ২০ বছরের এই তরুণ দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর দুই বন্ধু অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈনের জীবনের পক্ষে। নিজে বাঁচেননি, তাঁদেরও বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু বাঁচিয়েছিলেন সাহস, বন্ধুত্ব আর মানবিকতা।

ভয়ংকর সেই রাতে হোলি আর্টিজানের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর উদ্বিগ্ন মা সিমিন হোসেন। বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর ছোট ছেলেটি আর ফিরছে না। বন্ধুদের ছেড়ে চলে আসার ছেলে ফারাজ নয়। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে যান তিনি। তবে শূন্য সে হাত শূন্য থাকেনি, ভরে গেছে মানুষের ভালোবাসায়। এখন তাঁর গর্বিত পরিচয় তিনি ফারাজের মা।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষ। পবিত্র ঈদুল ফিতরের তখনো তিন দিন বাকি। ঈদের আনন্দ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি এ ঘটনায় হাহাকারে ভরে গিয়েছিল। বহু বিদেশি ওই হামলার শিকার হওয়ায় তার আঘাত গিয়ে পৌঁছেছিল সারা বিশ্বে। তার মধ্যেও আলো হয়ে ফুটে উঠেছিল ফারাজের ঘটনা।

ফারাজের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন বললেন, ‘ফারাজ চলে যাওয়ায় মাসহ পরিবারের সবাই ডুবে গিয়েছিল দুঃসহ বেদনায়। কিন্তু ফারাজ হয়ে উঠেছিল সবার গর্বও। মা স্বপ্ন দেখতেন, ফারাজ অনেক বড় হবে। ফারাজ যে এভাবে বিশ্বে বরণীয় হয়ে উঠবে, তা কি কল্পনাও করেছিলেন!’

সেগুনবাগিচার এক ক্লিনিকে ২০১৬ সালের ৭ নভেম্বর সন্তান হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহফুজুর রহমান চৌধুরী ও ফাহমিদা চৌধুরী দম্পতির। মাহফুজুর রহমান তার ডাকনাম রাখলেন ফারাজ।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ চত্বরে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট গড়ে তোলা হলো ‘ফারাজ চত্বর’। নাগেশ্বরগাছের চারা রোপণ করে সে চত্বরের উদ্বোধনীতে সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদল বললেন, ‘ফারাজ পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করেছে, বাঙালি মৃত্যুর কাছেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।’ দেশের আনাচকানাচে নানা সংগঠন ও পাঠাগারে তাঁকে নিয়ে হয়েছে আলোচনা সভা। ‘জঙ্গিবাদ নয়, ফারাজই বাংলাদেশ’, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ আয়োজনে এ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তরুণেরা শপথ নিয়েছেন জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের। রাজশাহীতে ফারাজের আত্মদানের কাহিনি মঞ্চস্থ করেছে মাদ্রাসাছাত্ররা। গত বছরের ১৯ জানুয়ারি সিলেটের এমসি কলেজের ঘুড়ি উৎসবে ফারাজের নামে ঘুড়ি বানিয়ে সাহসিকতা প্রচার করেছেন একদল তরুণ। নওগাঁয় ফারাজের নামে চালু হয়েছে বিলীয়মান বদন খেলা (গাদন) প্রতিযোগিতা।

বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় ফারাজ আইয়াজ হোসেনের নামে শিক্ষাবৃত্তি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। একজন শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তাতে বিনা বেতনে পড়তে পারবেন।

২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালী অতীত ক্লাব ও গ্রিন ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘ফারাজ চ্যালেঞ্জ কাপ’। ডিসট্রেস্‌ড্‌ চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে ফারাজকে দেওয়া হয়েছে ‘২০১৭ হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাওয়ার্ড’। ওষুধ উৎপাদক কোম্পানি এসকেএফ টঙ্গীর চেরাগ আলীতে গত বছরের ১৫ এপ্রিল তাদের নতুন কারখানা ভবনের নাম দিয়েছে ‘ফারাজ আইয়াজ হোসেন ভবন’। সাহসী এই তরুণের নামে ‘ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন’ করেছে তাঁর পরিবার। তারা কাজ করছে আর্তদের সেবায়।

তবে সবচেয়ে বড় আয়োজন পেপসিকো গ্লোবালের। ২০১৬ সালে তারা প্রবর্তন করে ‘ফারাজ হোসেন সাহসিকতা পুরস্কার’। আগামী ২০ বছর চলবে এ পুরস্কার। ২০১৬ সালে প্রথমবার এ পুরস্কার পান মাদারীপুর কলেজের কর্মচারী মিরাজ সরদার। একই কলেজের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর হামলাকারী জঙ্গিকে তিনি হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলেন। ২০১৭ সালে এ পুরস্কার পান প্রতিবেশীকে বাঁচাতে গিয়ে ছিনতাইকারীর হাতে নিহত খন্দকার আবু তালহা। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সনদের পাশাপাশি পেয়েছেন ১০ হাজার মার্কিন ডলার। অনন্য বন্ধুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ফারাজ হোসেনকে ভূষিত করা হয়েছে মাদার তেরেসা পুরস্কারে। ভারতের মুম্বাইয়ে পুরস্কারটি নেন সিমিন হোসেন ও যারেফ আয়াত হোসেন।

ফারাজ হোসেনকে ২০১৮ সালের সমাবর্তনে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গয়জুয়েতা স্কুল অব বিজনেস। মৃত্যুবরণ করার সময় ফারাজের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার দুই বছর বাকি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তন করেছে ‘ফারাজ হোসেন কোর ভ্যালু অ্যাওয়ার্ড’ও।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, মানবতার কল্যাণে অবদান রাখা মানুষের স্মৃতিরক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও স্মৃতিফলক স্থাপন করে থাকে গার্ডেন অব দ্য রাইচাস ওয়ার্ল্ডওয়াইড বা গারিও। এই উদ্যোগে জড়িত ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইতালির মিলানভিত্তিক অলাভজনক এ সংগঠনটি ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই পাঁচজন ন্যায়নিষ্ঠ আরব ও মুসলিম ব্যক্তির স্মৃতির উদ্দেশে তিউনিসিয়ায় ইতালির দূতাবাসে ‘স্মৃতি-উদ্যান’টি স্থাপন করে। সেখানে ফারাজের নামে স্মৃতিফলক স্থাপন ও একটি বৃক্ষ রোপণ করা হয়। চলতি বছরের মার্চে ইতালির বেনেভোন্তো প্রদেশের রুমো হাইস্কুলে একটি গাছ লাগানো হয় ফারাজের স্মরণে।

যারেফ হোসেন বলেন, ‘ফারাজ যা করেছে তা হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষও করতে পারত না। ফারাজ যে সারা পৃথিবীর মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, ভাই হিসেবে সে কারণে আমি গর্ববোধ করি। ফারাজ বেঁচে আছে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।’