বরগুনায় বিভিন্ন শিশুসদনের নামে জিআরের (মানবিক সহায়তা) চাল বরাদ্দ এনে বিক্রি করে একটি চক্র অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের যোগসাজশে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এই লুটপাট চালাচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই শর্তানুযায়ী পর্যাপ্ত এতিম নেই। আবার কিছু আছে নামসর্বস্ব।
সংশ্লিষ্ট এতিমখানাগুলোর কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সাংসদের ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) নিয়ে আনোয়ার হোসেন ওরফে একিন আলী নামের এক ব্যক্তি মন্ত্রণালয় থেকে চাল বরাদ্দ আনেন। পরে নিজেই ডিলারদের কাছে তা বিক্রি করে খরচ বাবদ অর্ধেকের বেশি অর্থ নিয়ে নেন। আবার বরাদ্দ তালিকায় কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে কোনো অর্থই দেন না।
তবে আনোয়ার হোসেন এসব অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এর সঙ্গে জড়িত নই। কেউ বলতে পারবে না যে আমি বরাদ্দ এনে অর্ধেক টাকা নিই।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ১০ জুন বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলার ৫৫টি শিশুসদনের নামে তিন মেট্রিক টন করে মোট ১৬৫ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ ছাড় করে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৫টিতে আরও দুই মেট্রিক টন করে চালের বরাদ্দ ছাড় দেওয়া হয়।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর ই আলম বলেন, ‘শিশুসদনগুলোর নিবন্ধন যাচাই করে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কাছে আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি।’ আমতলীর ইউএনও মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি তদন্ত করে তালিকাভুক্ত এতিমখানার নিবন্ধন যথাযথ পেয়েছি। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ১০ জনের কম এতিম আছে—এমন প্রতিষ্ঠান সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
আমতলী উপজেলা মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি সাধারণ সম্পাদক ও তালতলী উপজেলার চন্দনতলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার আবুল হোসেন বলেন, ‘আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তিন উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানার নামে জিআর বরাদ্দ আনার কাজ করছেন। এ জন্য তাঁকে অর্ধেক অর্থ দিতে হয়। বাকি অর্ধেক প্রতিষ্ঠান পায়।’
জুন মাসে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া সদর উপজেলার কে শিংড়াবুনিয়া ইসলামিয়া শিশুসদনে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এতিমখানার কোনো কার্যক্রম নেই। পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নেসার উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো এতিম নেই। আমরা কোনো চাল পাইনি।’
মধ্য কেওড়াবুনিয়া নাজির শিশুসদন ও দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, কাগজপত্রে মহিলা শিশুসদন হলেও এখানে শিক্ষার্থীই নেই। এতিমখানার নামে গত জুনে তিন মেট্রিক টন এবং চলতি মাসে আরও দুই মেট্রিক টন জিআরের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার বেশ কয়েকজন জানান, রাতে কয়েকজন ছাত্র এই মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে এসে পড়াশোনা করে। এসব ছাত্র বাড়ি থেকে ভাত নিয়ে আসে।
এতিমখানার পরিচালক ও মাদ্রাসার সুপার গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমাদের এতিমখানায় পাঁচ-ছয়জন ছাত্র থাকে। কিন্তু কোনো মেয়ে এতিম নেই। এখানে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নয়জন এতিমের নামে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
সদরের সাহেবের হাওলা চাঁদবরু এতিমখানায় ১৬ জন এতিম আছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইব্রাহিম খলিল দাবি করলেও বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির নামে দুই দফায় মিলিয়ে পাঁচ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আলী বলেন, এতিমদের নামে বরাদ্দ চাল আত্মসাৎ করা অন্যায়। কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনের সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘জিআর সহায়তার চাল বাইরে বিক্রি করা বেআইনি। এটা দেওয়া হয় এতিম শিক্ষার্থীর খোরাকির জন্য। অনেক ব্যক্তি এতিমখানার সহায়তার জন্য আমার কাছে আসে। আমি ডিও লেটার দিই। এটার কেউ অপব্যবহার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’