বাংলাদেশের ২১ ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানের নাম

বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত অর্থ পাচারের ‘পানামা পেপারস’ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের ২১ ব্যক্তি, ৩ প্রতিষ্ঠানের নাম ও ১৮টি ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) বাংলাদেশ সময় গত সোমবার মধ্যরাতের পর বাংলাদেশি এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে। বলা হচ্ছে, এরা কর ফাঁকি দিয়ে অন্য দেশে অর্থ পাচার করেছে।
পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির আইসিআইজে প্রকাশিত তালিকায় যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ঠিকানা রয়েছে, তারা কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে, তার কোনো বিবরণ নেই। এমনকি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারিত পরিচয়ও নেই। তবে প্রকাশিত নাম ও ঠিকানা ধরে গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলো সরেজমিনে অনুসন্ধান করে কয়েকজনের পরিচিতি উদ্ধার করেছে।
তালিকায় যাঁদের নাম: বাংলাদেশি যেসব ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়েছে তাঁরা হলেন কফিল এইচ এস মুয়িদ, পেসিনা স্টেফানো, রুডি বেঞ্জামিন, ইউসুফ রায়হান রেজা, ইশরাক আহমেদ, নভেরা চৌধুরী, মোহাম্মদ ফরহাদ গণি, মেহবুব চৌধুরী, বিলকিস ফাতিমা জেসমিন, রজার বার্ব, আবুল বাসার, জাইন ওমর, বেনজির আহমেদ, আফজালুর রহমান, সুধীর মল্লিক, জীবন কুমার সরকার, নিজাম এম সেলিম, মোহাম্মদ মোকসেদুল ইসলাম, মোতাজ্জেরুল ইসলাম ও সেলিমুজ্জামান। এঁদের মধ্যে আফজালুর রহমান ও মোতাজ্জেরুল ইসলামের নাম দুবার করে রয়েছে। এর বাইরে কোনো নাম উল্লেখ না করে ‘দ্য বেয়ারার’ হিসেবে একটি নাম রয়েছে, তা-ও আবার দুবার।
পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির সঙ্গে অফশোর লিকসের ঘটনায় বেরিয়ে আসা কিছু নামও একসঙ্গে যুক্ত করে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি আরও ২৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এই নামগুলো ২০১৩ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলো হলো বাংলাদেশ বিমান ইনকরপোরেশন, ইসলামিক সলিডারিটি শিপিং কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল এজেন্সিজ লিমিটেড। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল দুটির সংযোগ হিসেবে হংকংয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে। আর ইসলামিক সলিডারিটি শিপিং কোম্পানির সংযোগ দেখানো হয়েছে সৌদি আরবকে।
এর বাইরে প্রতিষ্ঠানের তালিকায় একই সঙ্গে অফশোর লিকসের ঘটনায় উঠে আসা দুই বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো এসার বাংলাদেশ হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেড ও টেলিকম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। এসার বাংলাদেশ হোল্ডিংসের সংযোগ হিসেবে সিঙ্গাপুর ও টেলিকম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির সংযোগ হিসেবে সাইপ্রাসের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের নাম রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অর্থ বা কোনো সম্পদ বাইরে নিয়ে যাওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। শুধু ভ্রমণ, চিকিৎসা খরচ বাবদ নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ বাইরে নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত কাজে এলসি বা লেটার অব ক্রেডিটের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিদেশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা যায়। এর বাইরে রপ্তানিকারকেরা রপ্তানি আয়ের ১৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যাংক হিসাবে রাখতে পারে।
ঠিকানা ধরে সরেজমিন: পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের যে ১৮টি ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে, তার ১০টিতে গতকাল সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়েছে প্রথম আলো। রাজধানীর বাংলামোটরের ১১৩ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে অবস্থিত কনকর্ড টাওয়ারের নবম তলায় স্যুইট নম্বর ৯০১-এ গিয়ে দেখা যায়, সেটি এক্সেস টেলিকমের কার্যালয়। এই এক্সেস টেলিকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রেসিডেন্ট জাইন ওমর, পরিচালক জারি ওমর ও জাকি ওমর। এঁদের মধ্যে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে জাইন ওমরের নাম রয়েছে।
রাজধানীর বড় মগবাজারের ১৭০/এ আউটার সার্কুলার রোডের যে ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসের ৪/এ সড়কের ৪/এ নম্বর বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে বাড়ির প্রবেশ গেটে একটি নোটিশ দেখা যায়। তাতে লেখা, রেজিস্ট্রি বায়নাসূত্রে এ বাড়ির মালিক মো. মোকসেদুল ইসলাম গং। জায়গাটির মালিকানা নিয়ে জেলা জজ আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। সেখানে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, মোকসেদুল ইসলামের আরেক ভাই মোতাজ্জেরুল ইসলাম। এই দুই ভাইয়ের নামই রয়েছে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশিদের নামের তালিকায়। মোতাজ্জেরুল দেশের স্বাস্থ্য খাতের একজন ঠিকাদার এবং তাঁর মালিকানায় হাসপাতালসহ একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ১ নম্বর সড়কে ৩১ নম্বর বাড়িরও একটি ঠিকানা ছিল। কিন্তু সরেজমিনে সেটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর গুলশান ১-এর ২২ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে প্রকাশিত গুলশান ১-এর ১২৩ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর ‘খুরশিদ মহল’ নামের বাড়িটির ১ নম্বর বাসাটির ঠিকানা পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই বাসাটির মালিক শহিদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাতায়াত থাকলেও বিদেশে কোনো কোম্পানি খোলেননি।
বাড়িটির পাঁচতলায় আইডিই নামে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কার্যালয় রয়েছে। আর চতুর্থ তলায় রয়েছে এসবিএস ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এবং ব্রেথ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপের কার্যালয়। এ ছাড়া বাড়িটিতে স্বাধীন নিটিং অ্যান্ড টেক্সটাইল, আজাদ কনস্ট্রাকশন, এজি হাইটেক নামের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কেউই পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি বা অর্থ পাচারের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেননি।
রাজধানীর বারিধারার ১ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বরের বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা এই বাড়ির প্রতি তলায় রয়েছে দুটি করে ফ্ল্যাট। বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মী জানান, ফ্ল্যাটমালিকদের কেউ কেউ দেশের বাইরে থাকেন। একই এলাকার ৬ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িটিতে গিয়ে জানা গেছে, আবাসিক এ ভবনটিতে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে।
রাজধানীর ৬৫-৬৬ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ঠিকানাটি ঢাকা চেম্বার ভবন। এ ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে প্রকাশিত তথ্যে।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ এলাকার হিলভিউ আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়িটির কোনো সন্ধান মেলেনি সরেজমিনে।
পানামাভিত্তিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার গোপন নথি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলোচিত ব্যক্তিদের অর্থ পাচারসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস করে দেয় আইসিআইজে। অর্থ পাচারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁসের এ ঘটনার নাম দেওয়া হয় ‘পানামা পেপারস’। গত এপ্রিলে এ তথ্য পাচারের ঘটনা প্রকাশ করা হয়। তখন থেকেই তা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। পানামা পেপারসে বেরিয়ে আসে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, তারকাসহ অনেকের নাম।
আইসিআইজের ওয়েবসাইটে থাকা প্রতিবেদনে বলা হয়, মোসাক ফনসেকার নথিতে বিশ্বের ২০০ দেশের ২ লাখ ১৪ হাজার ব্যক্তির টাকা পাচারের নথি আছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে ১৪০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাজনীতিকের নাম রয়েছে। এসব ব্যক্তি বিশ্বের ২১টি কর রেয়াত পাওয়া অঞ্চলে পাঠানো টাকায় গড়ে তুলেছেন তথাকথিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।