বাগেরহাটে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত প্রশাসন, মোংলা বন্দর স্বাভাবিক

ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে বৃষ্টি ও মাঠ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় পাকা ধান দ্রুত কেটে নিচ্ছেন কৃষক। বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের ভাটছালা গ্রাম
ছবি: প্রথম আলো

ঘূর্ণিঝড় অশনির আঘাতের আশঙ্কায় জেলার উপকূলীয় এলাকার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে বাগেরহাটের প্রশাসন। দুর্যোগকালীন নদী-তীরবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। ঝড়ের পূর্বাভাসে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরেছেন জেলেরা।

ঘূর্ণিঝড় অশনির গতিপ্রকৃতি দেখে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এখন পর্যন্ত ঝড়টির বাংলাদেশের দিকে আসার আশঙ্কা কম। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গতকাল সোমবার বাগেরহাটসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক কৃষক। তবে এরই মধ্যে জেলার ৯০ ভাগের বেশি কৃষক জমি থেকে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। তবে ঝড়ের কোনো প্রভাব পড়েনি দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলায়। স্বাভাবিকভাবে চলছে বন্দরের সব কার্যক্রম। মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দরে চারটি জাহাজ থেকে চলছে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার মো. ফকরউদ্দিন বলেন, মোংলা বন্দরে বর্তমানে চারটি জাহাজ অবস্থান করছে। জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ চলছে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত না বাড়া পর্যন্ত বন্দরের সব কাজ স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে মোংলা বন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলার পর বন্দরের সব নৌযান নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মোংলার কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর ছোট-বড় জাহাজগুলোকে বন্দরে এনে রাখা হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি শেখ ইদ্রিস আলী বলেন, ঘূর্ণিঝড় অশনির পূর্বাভাস পেয়ে জেলেরা ট্রলার নিয়ে নিরাপদ স্থানে ফিরেছেন। আর যাঁরা এখনো ফিরতে পারেননি, তাঁরা পাশের নদী-খালে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। জেলেরা আগের থেকে এখন অনেক সচেতন। তবে এই জেলেরা যখন গভীর সমুদ্রে থাকেন, তখন হঠাৎ কোনো দুর্যোগ এলে তাঁরা কোনো খবর পান না। সম্প্রতি হঠাৎ কালবৈশাখীর কবলে পড়ে ১০ জেলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাই সাগরে মাছ ধরা জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগের আধুনিক ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।

ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে সোমবার দিনভর থেমে থেকে বৃষ্টি হলেও মঙ্গলবার তেমন বৃষ্টিপাত হয়নি বাগেরহাটে। বৃষ্টি না হলেও দিনভর আবহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে জেলার সব এলাকায়। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিরাপদে থাকতে সুন্দরবনের বনকর্মীদেরও সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও বেলায়েত হোসেন বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কতা সংকেত বাড়ানো হলে বনের ঝুঁকিপূর্ণ টহল ফাঁড়িগুলো থেকে বনকর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হবে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন জেলার শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিডরে আপনজন, ঘরবাড়ি, জমিজমা হারিয়েছি। সিডরের পর আইলা, নার্গিস, বুলবুল, আম্পান, ইয়াসসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে মূল্যবান সম্পদও হারিয়েছি। তবে এখন উঁচু বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হওয়াতে আমরা কিছুটা নিরাপদ আছি। আল্লাহ যেন আমাদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেন।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ের উপপরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে বাগেরহাট জেলায় ৫৯ হাজার ২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৯০ ভাগের বেশি জমির পাকা ধান কেটে ঘরে তুলেছে কৃষকেরা। দুর্যোগে ক্ষতি হতে পারে, তেমন কোনো ফসল বর্তমানে মাঠে নেই। আর যা আছে, তা রক্ষা করতে বিভিন্ন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার মধ্য সাউথখালী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র
ছবি: প্রথম আলো

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, আবহাওয়া বিভাগ ঘূর্ণিঝড় অশনির পূর্বাভাস জারির পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগের সময় যাতে স্থানীয় লোকজন আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য জেলার ৩৪৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্কুল ও কলেজগুলো খুলে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ১৭ লাখ টাকা ও ৫৮৬ মেট্রিক চাল বরাদ্দ রয়েছে। পাশাপাশি ঝড়ের প্রভাবে অতিবৃষ্টি হলে যেন নিচু এলাকা জলাবদ্ধ না হয়ে পড়ে সে জন্য নদী ও খালের স্লুইসগেটগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।