বাজেটে নারীদের জন্য কী আছে, সুস্পষ্ট নয়

ফাইল ছবি

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে গত বৃহস্পতিবার ৫০তম বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। নতুন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ‘জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’। বাজেট কতটুকু নারীবান্ধব হলো, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট হলো কি না, সেই আলোচনার সুরটা বুঝতে বৃহস্পতিবার বাজেট ঘোষণার পর থেকে নারী ও মানবাধিকারকর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়। মোটাদাগে তাঁরা বলছেন, বাজেটে কিছুই তো পরিষ্কার হলো না।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় কালেভদ্রে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ শব্দটি ছিল বা ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলেছেন, কিন্তু প্রাধান্য কোন কোন খাতে দেওয়া হবে, বরাদ্দ কোথায় আছে, তার কিছুই নেই। বলতে গেলে নারীর বিষয়টি বয়স্ক ভাতা, স্বামী নিগৃহীতা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতায় আটকে গেছে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর দেশ ও বিদেশের নানান গবেষণা-জরিপে বলা হচ্ছে, নারী কাজ হারিয়েছে, ঘরে-বাইরে নারীর ওপর কাজের চাপ বেড়েছে, বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন। পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া তালিকায় মেয়েদের সংখ্যাই বেশি থাকবে। পরিবারের সদস্যদের ও রোগীদের পরিচর্যা চাপ সামলাতে হচ্ছে নারীদের। উচ্চশিক্ষায় ইস্তফা দিতে হয়েছে অনেক নারীকে। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ করার যে সুযোগ ছিল, তা সরকার কাজে লাগায়নি। বাল্যবিবাহ, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতন নিয়েও তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি।

তবে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, করোনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে সরকার। তবে এ বক্তব্যের আর কোনো ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ দেওয়া হয়নি। বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত দেশে ৫৮ লাখ ২২ হাজার ১৫৭ জন করোনার টিকা পেয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৬ লাখ ১০ হাজার ৬৩৫ এবং ২২ লাখ ১১ হাজার ৫২২ জন নারী টিকা পেয়েছেন। নারীর টিকা পাওয়ার সংখ্যা কেন কম বা বাড়ানোর জন্য কোনো উদ্যোগের কথা বলা নেই। গৃহকর্মে নারীর শ্রমকে আর্থিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়টিও পাত্তা পায়নি। করোনায় শহরাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ হারানো নারীদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগের কথা নেই বাজেটে। শুধু বাজেট বক্তৃতায় ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুকল্যাণ’ নামে ছোট একটি প্যারা রাখা হয়েছে।
অথচ বাজেট ঘোষণার দিনই মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, এ বছরের বাজেট করোনা মহামারি মোকাবিলা করে দেশের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে। এই বাজেটের বাস্তবায়ন, সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় মহামারি কাটিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষত নারীদের, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইউএনডিপির যৌথ আয়োজনে ‘জেন্ডার ক্লাইমেট নেক্সাস: টু ওয়ার্ডস ইক্যুইটেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ট্রান্সফরমেশন’ বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথম চারটি মন্ত্রণালয়ের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব করেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে মোট ৪৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে করোনার জন্য কাটছাঁটের প্রক্রিয়ায় আলাদা করে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হচ্ছে না। ফলে, কোন মন্ত্রণালয়, কোন প্রকল্প বা কর্মসূচির জন্য কত বরাদ্দ পাচ্ছে, বরাদ্দ বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন বিষয় অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। নারী উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নারীদের উন্নয়নে গৃহীত নীতি-কৌশল, কার্যক্রম, বরাদ্দ করা বাজেটের বিবরণ প্রদর্শনের জন্যই জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।

জেন্ডার বাজেট বা জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট নারীর জন্য পৃথক বাজেট নয়, নারী ও পুরুষের ওপর বাজেটের যে পৃথক প্রভাব এবং নারী-পুরুষের চাহিদার যে ভিন্নতা, তাকে আমলে নিয়ে বাজেট বরাদ্দকে বোঝায়।

করোনার প্রাদুর্ভাবের পর নারীর জন্য বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অথচ আগামী বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় নারী ও শিশু নেই। স্বাস্থ্য, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন, কৃষি, শিক্ষা ও দক্ষতা, পল্লি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, গৃহ নির্মাণ, খাদ্য বিতরণ প্রভৃতি অগ্রাধিকারের ভিড়ে হারিয়ে গেছে নারী ও শিশুর বিষয়টি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী নিগৃহীতদের জন্য ভাতা, ভিজিডির আওতায় খাদ্য ও আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে সহায়তা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, দরিদ্র ‘মা’দের মাতৃত্ব ভাতা, কর্মজীবী ল্যাকটেটিং ‘মা’দের ভাতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বারবার তুলে ধরা হয়েছে।

৪ জুন প্রথম আলোকে সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ছে। নতুন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এর আওতায় আসছে। কিন্তু এই অর্থের পরিমাণ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। পুরো বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ। দুস্থ নারীরাই এর মূল সুবিধাভোগী। ৫০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন ১ হাজার ৮৬২ টাকা। আবার ভারতে এই ভাতার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। এখন আমরা যদি মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকি, তাহলে আমরা অন্তত তাদের সমান ভাতা দিই না কেন?’
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের বাল্যবিবাহ নির্মূলের পরিকল্পনার কথা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তবে করোনায় এ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হলো কি না, তা বলা হয়নি। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন বা বিধিমালা বাস্তবায়নে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। করোনায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, এগুলো খুললে আসলেই কত মেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারবে, তা নিয়েও কোনো কথা নেই। এই মেয়েগুলো যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরে, তার জন্যও তো কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

করোনায় নারী নির্যাতন বেড়েছে, তা নিয়ে তো কেউ দ্বিমত করছে না। তবে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, মোবাইল অ্যাপস ‘জয়’–এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে—এ ধরনের কিছু বাক্যের বাইরে স্পষ্ট করে আর কিছুর উল্লেখ নেই।

বাজেট বক্তৃতায় অভিবাসী নারী কর্মীদের জন্য বিদেশ যাওয়ার আগে ৩০ দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ, নারী কর্মী নির্বাচন ও ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম জেলাপর্যায়ে সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, বিএমইটিতে নারী কর্মী অভিযোগ সেল ও বিদেশে সেফ হোমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছর ২১ হাজার ৯৩৪ জন নারীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে করোনায় কত নারী দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন অথবা করোনায় নারী কর্মীরা অন্য যেসব সমস্যার মধ্যে আছেন, তার উল্লেখ নেই বা সমাধানের কোনো কথা নেই।

কিছু সুখবরও আছে

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৪ হাজার ১৯১ কোটি টকা বরাদ্দের প্রস্তাবের কথা জানানো হয়েছে, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বড় সুখবর হলো দেশে উৎপাদিত ন্যাপকিনের সমুদয় মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দুই বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাত ও নারীর উন্নয়নে এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে ব্যবসার মোট বার্ষিক লেনদেনের (টার্নওভার) ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ৩ জুন বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ধন্যবাদ দিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতিও দিয়েছে। তবে বিবৃতিতে ২০২১-২২ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা বিবেচনা করে নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই খাতে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখাসহ বেশ কিছু সুপারিশও করেছে।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, নতুন করে আরও ১২০ উপজেলার আট লাখ বয়স্ক নাগরিককে ভাতার আওতায় আনতে চায় সরকার। এ জন্য বয়স্ক ভাতা বাবদ অতিরিক্ত ৪৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। অতি উচ্চ ও উচ্চ দারিদ্র্যভুক্ত গ্রুপের বয়স্ক নাগরিকেরা এই ভাতা পাবেন। বর্তমানে ১১২ উপজেলার শতভাগ বয়স্ক মানুষ ভাতা পাচ্ছেন। তবে ভাতাপ্রাপ্ত নারীর সংখ্যা বা নতুন করে কত নারী এতে যুক্ত হবেন, তা উল্লেখ করা হয়নি।

বাজেটে দরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্য ৫৩টি উপজেলায় চলমান মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম আরও ২০টি উপজেলায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং ১২৩টি উপজেলায় জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম জোরদারকরণসহ কোন জেলা বা উপজেলাপর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের কী কী কার্যক্রম আছে, তার কিছু বিবরণ দেওয়া হয়েছে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন-২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিগগিরই জাতীয় সংসদে পাস হবে বলে যে বাজেট বক্তৃতায় যে সুখবর দেওয়া হয়েছে, তাতেও মূলত নারীরাই উপকৃত হবেন।