বাধা ডিঙিয়ে চা উৎপাদনে রেকর্ড করতে চায় চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের চা বাগান
ছবি: প্রথম আলো

প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করে চা উৎপাদনে অতীতের রেকর্ড ভাঙতে চায় চট্টগ্রামের চা-বাগানগুলো। উৎপাদনের নিম্নমুখিতাকে কাটিয়ে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত চায়ের উৎপাদন আশার সঞ্চার করেছে সংশ্লিষ্ট সবার মনে। চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৩ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২২ হাজার ৮৩৬ কেজি। এ বছর তাদের উৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ কেজি হবে বলে তারা আশা করছে।

এমনিতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে চট্টগ্রামের চায়ের উৎপাদন কম। এর প্রধান কারণ এখানকার প্রকৃতি। চট্টগ্রাম আর সিলেট ও পঞ্চগড়ের পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য আছে। চট্টগ্রামে সাধারণত বৃষ্টি শুরু হয় মে-জুন মাসে। সেটা অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। আর সিলেট, পঞ্চগড়ে বৃষ্টির দেখা মেলে মার্চ-এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। নয় মাসের বেশি সময় ধরে সেখানে চা উৎপাদিত হয়। অথচ চট্টগ্রামে চা উৎপাদনের জন্য সময় পাওয়া যায় সাত মাসের কম। ফলে প্রতি হেক্টরে গড়ে অন্য এলাকার তুলনায় চট্টগ্রামে চায়ের উৎপাদন কম।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ৯৬ দশমিক ৫১ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করে জাতীয় রেকর্ড করলেও চট্টগ্রামের ২৩টি বাগানে ২০২০ সালের চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। চা বোর্ডের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি হেক্টরে জাতীয় উৎপাদন গড়ে ১ হাজার ৭২২ কেজি। সেখানে চট্টগ্রামের পাঁচটা বাগানের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৩০০ থেকে ৩৫০-এর বেশি ওঠে না। যার ফলে চট্টগ্রামের গড় উৎপাদন জাতীয় উৎপাদনের চেয়ে কমে গেছে।

বাংলাদেশ চা সংসদের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর (২০২১ সালে) চট্টগ্রামে চা উৎপাদিত হয়েছে ৯৬ লাখ ৫২ হাজার ৮২২ কেজি। এর আগের বছর উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৫ কেজি। ২০২১ সালে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ কম উৎপাদিত হয়েছে। এই নিম্নমুখী প্রবণতা এখন বন্ধ হয়েছে আমাদের প্রচেষ্টায়। এ বছর এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব দেখলেই তা বোঝা যাবে।

প্রাকৃতিক বা আবহাওয়া ছাড়া দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ইত্যাদি কারণেও চট্টগ্রামে চায়ের উৎপাদন কম। বাংলাদেশ চা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, চা উৎপাদকদের আশা পূরণে এসব দুর্বলতা কাটাতে হবে। তাঁরা বলেন, চার-পাঁচটি চা-বাগান ছাড়া বেশির ভাগ বাগানের ব্যবস্থাপনাকে আরও মজবুত করতে হবে। দক্ষ জনবল সংকটও দূর করতে হবে। যেমন টি মেকার, টার্নার, ফিডার-এ ধরনের কারিগরি জনবলেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। চায়ের ক্ষেত্রে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো যে মান রক্ষা করে, সেটাও এখান বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।

এই প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যান্য সংকট পেরিয়ে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব? জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা বোর্ডের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমদ বলেন, এটা কোনো কঠিন বিষয় নয়। বিজ্ঞানের কৃপায় প্রকৌশল অর্জন করছে মানুষ। কারিগরি দিক উন্নত হচ্ছে দিন দিন। প্রথমত বৃষ্টিহীনতার বিকল্প হিসেবে প্রচুর জলাশয় তৈরি করতে হবে। চায়ের পাশাপাশি বাগানে প্রচুর ফলদ গাছ তৈরি করতে হবে। পুরো বাগান যেন ছায়ার মায়ায় থাকে সারা বছর। গাছশূন্য কোনো বাগান থাকতে পারবে না।

এ প্রসঙ্গে মুনির আহমদ উত্তরবঙ্গের উদাহরণ টেনে বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলে চায়ের উৎপাদন ছিল মাত্র দেড় মিলিয়ন। কিন্তু ২১ সালে এসে তারা ১৪ দশমিক ৫০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করে। চা চাষ ও উৎপাদন বাড়াতে একদা মঙ্গাপীড়িত উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে। পঞ্চগড়ের মাটির নিচে পাথর। সেখানে অন্য কোনো উদ্ভিদ উৎপাদন লাভজনক ছিল না। ওখানে চা উৎপাদন শুরু হওয়ার পর মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে গেছে। যারা একসময় খেতে পারতেন না, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারতেন না। তাঁরাই এখন বিভাগীয় শহরগুলোয় ছেলেমেয়েদের পাঠাচ্ছেন পড়ালেখা করানোর জন্য।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে চায়ের উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ টি বোর্ডের কোনো পরিকল্পনা বা কোনো কর্মসূচি আছে কি না, জানতে চাইলে মুনির আহমদ বলেন, ‘ফটিকছড়ি চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপকেন্দ্রে একটি সয়েল (মাটি) ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে। সেখান থেকে এখন চট্টগ্রামের সব ধরনের মাটির নমুনা পরীক্ষা করা হবে। বিজ্ঞানীরা অ্যাডভাইজরি ওয়ার্ক শুরু করেছেন। ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুলের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে দক্ষতা বাড়ানো যায়। এ ছাড়া নতুন ম্যানেজারদের আমরা শ্রীমঙ্গলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি।’ এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, চায়ের উৎপাদন ও এর সার্বিক বিকাশের জন্য বাঁশখালীতে রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।

চট্টগ্রামে ২২টি চা-বাগান কর্তৃপক্ষ সব প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চায়ের উৎপাদন বাড়াতে চায়। চা সংসদ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বড় একটা লক্ষ্যমাত্রা ধরেছি। ইনশা আল্লাহ সফল হব। বছরের প্রথম চার মাসের উৎপাদন সেটারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। আমরা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর জন্য এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মাদার ক্লাব তৈরি করছি। শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার করছি। শিক্ষা, চিকিৎসার ইত্যাদির ব্যবস্থা করছি।’

চা গবেষক ও ওয়াগগাছড়া টি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকতে পারে না। কারণ, চট্টগ্রামে চা চাষের ঐতিহ্য প্রায় ২০০ বছরের। সারা দেশের মধ্যে চট্টগ্রামেই প্রথম চা চাষ শুরু হয়, সেটা ১৮৪০ সালের ঘটনা। চট্টগ্রামের পাইওনিয়ার পাহাড়, টাইগার পাস, লালখান বাজার পুলিশ ক্যাম্প এলাকার উপত্যকা নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রথম চা–বাগানের গোড়াপত্তন হয়। চট্টগ্রামের ২০০ বছরের ইতিহাসে যেন ছেদ না পড়ে। অন্যান্য অনেক খাতের মতো চায়ের ক্ষেত্রেও যেন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখে, সেটাই সবার আশা।