বাবার অপেক্ষায় ছেলে, দ্বারে দ্বারে স্ত্রী

বাবা ছাড়া এত দিন এর আগে কখনোই থাকতে হয়নি আমীর হামজার। সবশেষে মুঠোফোনে কথা হয়েছিল জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ। বাবা বলেছিলেন, সকাল হলেই ফিরবেন। সন্তানের আবদার ছিল একটা নীল টেনিস বল। কিন্তু সেই নীল বল নিয়ে এখনো ফেরেননি বাবা। মাগুরা শহরের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী আমীর হামজার (৬) বাবা চাঁদ আলী ফারাজী নিখোঁজ রয়েছেন ৩৯ দিন।
নিখোঁজ স্বামীর খোঁজে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন দুই সন্তানের জননী ফাতেমা বেগম। মাগুরা শহরের বকসী মার্কেট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তাঁরা। পাট ব্যবসায়ী চাঁদ আলী ফারাজীর স্থায়ী বাড়ি মাগুরা সদরের বারইখালি গ্রামে। ২৫ জানুয়ারি মোংলায় চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তিনি। মাগুরা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে সদর থানার পুলিশ।
চাঁদ আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম জানান, গ্রামের বাড়িতে জমি নিয়ে তাঁর স্বামীর সঙ্গে চাঁদ আলীর চাচাতো ভাই একই গ্রামের আবুল খায়ের ফারাজীর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে, যা নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে। আবুল খায়ের বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ মেটানোর জন্য চাঁদ আলীর সঙ্গে আলোচনা করে আসছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসে ওইডি হিসেবেকর্মরত আবুল খায়ের ফারাজী তাঁর চাচাতো ভাই চাঁদ আলীকে মোংলায় তাঁর কর্মস্থলে দেখা করার জন্য যেতে বলেন।
ফাতেমার দাবি, আবুল খায়ের ফারাজীর সঙ্গে দেখা করতেই চাঁদ আলী ২৩ জানুয়ারি মাগুরার বাড়ি থেকে বের হন। ওই দিন দেখা করার পর ২৫ তারিখ টাকা দিয়ে বিরোধ মেটানো হবে বলে আবার তাঁকে দেখা করতে বলা হয়। এ কারণে বাড়ি না ফিরে খুলনায় ছোট ভাই জামিল ফারাজীর বাসায় থেকে যান চাঁদ আলী।
খুলনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জামিল ফারাজী জানিয়েছেন, ২৫ জানুয়ারি সকালে মোংলার উদ্দেশে বেরিয়ে যান তাঁর ভাই। এরপর রাতে ভাবির কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর ভাইয়ের মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে।
ফাতেমা বেগম বলেন, সর্বশেষ তাঁর স্বামীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায়। চাঁদ আলী তখন জানিয়েছিলেন, চাচাতো ভাই আবুল খায়েরের সঙ্গে একটি মাছের খামারে আছেন। সঙ্গে আছেন আবুল খায়েরের মাছের খামার ব্যবসায় অংশীদার আরও কয়েকজন। টাকা নিয়ে সকালে বাড়ি ফিরবেন তিনি। এরপর থেকেই তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তী দুই দিনেও স্বামীর খোঁজ না পেয়ে ২৭ জানুয়ারি মোংলা নেভি ক্যাম্পে যান তিনি (ফাতেমা বেগম)। দেখা করেন আবুল খায়েরের সঙ্গে। তখন তিনি চাঁদ আলীর সঙ্গে দেখা করার কথা অস্বীকার করেন।
মাগুরা সদর থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল যেখানে, সেই থানায় মামলা করতে হয়। তাই সাধারণ ডায়েরি করে তাঁদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সাধারণ ডায়েরি ও আদালতের নির্দেশে বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছেন মাগুরা সদর থানার এসআই আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, চাঁদ আলী মোংলা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁরা অনেকটাই নিশ্চিত হতে পেরেছেন। আবুল খায়েরের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা বলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, মাগুরা পুলিশের একটি চিঠিতে ১০ মার্চ আবুল খায়েরের সেখানে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। সে অনুযায়ী তাঁকে রিলিজ দেওয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন।