বায়ুদূষণ
বড় শহরে ধুলার সঙ্গে বাড়ছে ক্ষতিকর গ্যাস
দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘ফিজিকস অ্যান্ড কেমিস্ট্রি অব দ্য আর্থ’ শীর্ষক বিজ্ঞান সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্বের বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস বা হটস্পট হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়া। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ ঘটছে বাংলাদেশে। ঢাকাসহ বড় শহরের বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পাশাপাশি ক্ষতিকর গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বাতাসে এসব বাড়ছেও দ্রুত। ফলে নগরবাসীর জন্য তা দীর্ঘমেয়াদি বিপদ বাড়াচ্ছে, তৈরি করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। গত বছর বিশ্বব্যাংক থেকে করা দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণ নিয়ে করা গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘ফিজিকস অ্যান্ড কেমিস্ট্রি অব দ্য আর্থ’ শীর্ষক বিজ্ঞান সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সরফরাজ গনি আদনান, লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতুন এ জান্নাত এতে জড়িত ছিলেন। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক আশরাফ দেওয়ান। এ ছাড়া অস্ট্রিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড সিস্টেম অ্যানালাইসিস গবেষণার একটি অংশে কাজ করেছে।
গবেষণায় বায়ুদূষণ নিয়ে নতুন এক বিপদের কথা বলা হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যেতে দেখা গেছে। জনসংখ্যা ও যানবাহন চলাচল বেশি এবং বেশি সংখ্যায় উন্নয়ন প্রকল্প চলছে—এমন এলাকাগুলোতে এ গ্যাস বাড়ছে। এত দিন ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এসব বস্তুকণার পাশাপাশি এই গ্যাস বাতাসকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে।
বাতাসে এসব ক্ষতিকর উপাদান কমাতে না পারলে এ শহরের বেশির ভাগ মানুষ পর্যায়ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ঢাকা বসবাসের আরও অযোগ্য হয়ে যাবে।আশরাফ দেওয়ান, গবেষক, কার্টিন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
আশরাফ দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নগরগুলোতে জনসংখ্যা এবং বসতি এলাকা বাড়ছে। সেই সঙ্গে যানবাহন বাড়ছে, শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। ফলে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার সঙ্গে এই গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যেতে দেখছি। বাতাসে এসব উপাদান কমাতে না পারলে এ শহরের বেশির ভাগ মানুষ পর্যায়ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ঢাকা বসবাসের আরও অযোগ্য হয়ে যাবে।’
‘কমছে আয়ু’
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিইউএইচও) মানমাত্রার চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রধান শহরগুলোর বায়ুর মান ৩ থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বেশি খারাপ। এ অঞ্চলে মানুষের মৃত্যুর কারণের মধ্যে বায়ুদূষণের অবস্থান তৃতীয়। গড়ে এ অঞ্চলের ৯৫ শতাংশ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে। বাংলাদেশে এ হার প্রায় শতভাগ। দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ু দূষণে মানুষের গড় আয়ু কমে যাওয়ার দিক থেকে শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশে গড়ে ১ দশমিক ৮৫ বছর আয়ু কমছে। ভারতে এ হার ১ দশমিক ৫৬ এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ৫৩ বছর।
বায়ুদূষণ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হচ্ছে, এটি মূলত সড়ক বা উন্মুক্ত স্থানে বেশি থাকে। কিন্তু ঘরও দূষণের প্রভাবের বাইরে নয়। এর কারণ হিসেবে বাইরের দূষিত বায়ু ঘরে প্রবেশ করার পাশাপাশি রান্নার কাজে ব্যবহার করা কাঠ, খড়সহ অন্যান্য জৈব বস্তু ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এ অঞ্চলের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ গ্রামে থাকে, যারা ঘরের মধ্যে দূষণের শিকার হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুদূষণ গবেষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর দূষণের চিত্র আমরা পাচ্ছি। কিন্তু কিছু এলাকায় দূষণ অন্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে অঞ্চলভিত্তিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।’
গবেষণায় বায়ুদূষণের মোট ৮টি বড় উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এরপর যথাক্রমে রয়েছে বড় শিল্পকারখানা, মাঝারি শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার দূষণ, শহরের বর্জ্য উন্মুক্ত জায়গায় পোড়ানো, ধান-গম কাটার পর খড় পোড়ানো, সার ও গবাদিপশুর মলমূত্র।
গবেষণা বলছে, দেশে বায়ুদূষণে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখছে ধুলা (৩০ শতাংশ)। মূলত বিভিন্ন নির্মাণকাজের ধুলা বাতাসে মিশে দূষণ ঘটাচ্ছে। মাঝারি শিল্পকারখানা থেকে ২০ শতাংশ দূষণ হয়। বায়ুদূষণের ১০ শতাংশের উৎস ইটভাটা।
তবে এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের জরিপে দেখা গিয়েছিল, ঢাকার বায়ুদূষণের অর্ধেক (৫০%) হচ্ছে তরল জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া ধোঁয়া ও ধুলা থেকে। ৪০ ভাগ দূষণের উৎস খড়, কাঠ, তুষের মতো জৈব বস্তুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা। ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস ইটভাটা (৫৫ শতাংশ)। ইটভাটা, ধোঁয়া ও ধুলা মিলে ছিল ৩৫ শতাংশ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে অভিযান পরিচালনার কারণে সেখান থেকে বায়ুদূষণ কমেছে। নির্মাণকাজের ধুলা থেকে দূষণ কমাতে ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনগুলোকে নিয়মিত সড়কে পানি ছিটাতে বলেছি। নির্মাণসামগ্রী ও মাটি-বালু ঢেকে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
নতুন বিপদ
বাতাসে দূষণ সৃষ্টিকারী গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড অন্যতম। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, আউটলেট ছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার, কেরোসিন, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দহন, তামাক, বজ্রপাত এবং কাঠ পোড়ানোর কারণে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই গ্যাসীয় পদার্থ তৈরি হয়। এটি হৃদ্রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগের কারণ হতে পারে।
২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড দূষণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ট্রপোমি নামে একটি ভূ-উপগ্রহের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়েও দূষণ পরিমাপ করা হয়।
দুভাবে প্রাপ্ত উপাত্ত তুলনা করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসে দূষণের তীব্রতা বেশি থাকে। এর মধ্যে দূষণের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করে নভেম্বরে। শীত মৌসুমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ও মুন্সিগঞ্জে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড সবচেয়ে বেশি ছিল। এ জেলাগুলো মূলত শিল্পপ্রধান।
গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যখন ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম ছিল, সে সময় দূষণ সর্বোচ্চ ছিল। বর্ষা মৌসুমে সাধারণত বৃষ্টিপাতের প্রভাবে দূষণের মাত্রা কম থাকে। যেসব শহর এলাকায় ঘন গাছপালা রয়েছে, সেখানে দূষণের পরিমাণ কম ছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বায়ুমান গবেষক সরফরাজ গনি আদনান বলেন, যেসব স্থানে এ ধরনের দূষণ রয়েছে, সেখানকার অধিবাসীদের মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। এ জন্য প্রচার-প্রচারণা চালানো যেতে পারে। বেশি দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি কর আরোপ করা যেতে পারে। আর সামগ্রিকভাবে শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।