ভারতীয় গরু এলেইবা কী, দেশি তো দেশিই!

‘কী যত্নই না করতাছি! ভুসি খাওয়াইতাছি, কুড়া খাওয়াইতাছি, খড়ও আছে। নিজের দিকে তাকাই না। আমার চোখ থাকে গরুগুলার দিকে।’

খয়েরি-কালো রঙের বিশাল ষাঁড় দেখিয়ে এ কথা বললেন আবদুল কুদ্দুস। তিনি সামায়রা অ্যাগ্রো নামের এক খামারের কর্মী। ঢাকার কেরানীগঞ্জের আতাশুর এলাকার এই খামারে থাকা ষাঁড়টির নাম ‘টমেটো’। টমেটোর মতো এই খামারে ছোট-বড় আকারের ৩০০ গরুর যত্ন-আত্তি করছেন কুদ্দুস। সকালে গোসল করিয়ে গা মুছে দেওয়া, এরপর একদফা খাওয়ানো, তারপর সিলিং ফ্যানের নিচে রেখে বাতাস দেওয়া। সকাল, দুপুর, রাত মিলিয়ে এভাবে সারা দিন কেটে যাচ্ছে আবদুল কুদ্দুসের। তাই গরুগুলো যেন তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয়। কোরবানি ঈদের সময় ঘনিয়ে আসায় আর মাত্র কয়েক দিন গরুগুলো পরিচর্যার সুযোগ পাবেন তিনি।

পরিচর্যা পর্বের মধ্যে গরু বেচাকেনার কাজও চলছে জোরেশোরে। ক্রেতাদের আনাগোনাও চলছে সব সময়। তাই নিজের খামারের গরুগুলোর দাম বেশ ভালো পাবেন—এমন আশায় বুক বাঁধছেন সামায়রা অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী আবু বকর ফরহাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার খামারের বেশির ভাগ গরু দেশি জাতের। ইন্ডিয়ান গরু এলেও ভয় নেই। কাস্টমাররা (ক্রেতা) আমার দেশি গরুই পছন্দ করবেন।’

ভারতীয় গরু রেখে দেশি গরুর বিক্রি হওয়ার কারণ সম্পর্কে আবু বকর ফরহাদ বলেন, ‘কোরবানির উপযোগী গরু গড়ে তোলার কাজটা আমাদের খামারে এক বছর আগে থেকেই শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু কিনে আনি। এরপর আমাদের খামারে রেখে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। নিয়ম করে তিনবেলা গরুগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই খাবার দেওয়া হয়। তাই ভারত থেকে যতই গরু আসুক না কেন, এর প্রভাব কোরবানির সময় পড়বে না। ক্রেতারা ভালো গরু হিসেবে দেশি গরুই কিনবেন।’

সামায়রা অ্যাগ্রোর মতো আশপাশের খামারগুলোতে একইভাবে গরু পরিচর্যা করা হচ্ছে। দিনরাত খামারিদের চোখে যেন ঘুম নেই। আতাশুর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে কোনাখোলা সেওশুর এলাকায় আনোয়ার সিটি অ্যাগ্রো ফার্ম। খামারটিতে টিনশেডের বড় এক ছাউনির নিচে সারি বেঁধে রাখা আছে ১২০টি গরু। ব্রাহমা, শাহিয়াল, ফিজিয়ানের মতো বিদেশি জাতের গরুর পাশাপাশি দেশি জাতের ছোট-বড় অনেক গরু।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দীন বলেন, এ জেলায় গত বছর কোরবানির ঈদে উপযুক্ত গরুর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০০। এবার সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪ হাজার ৪৬টি। প্রায় আড়াই শ গরু বেড়েছে।

দেশে কোরবানির উপযুক্ত গরুর সংখ্যা বাড়ার তথ্য দিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ভারতীয় ও মিয়ানমারের গরুর আসার পরিমাণও কমে আসছে। ২০১৭ সালে এই দুটি দেশ থেকে দুই লাখ গরু বাংলাদেশে আসে। এ বছর ভারত থেকে আসা গরুর সংখ্যা কমে হয়েছে দেড় লাখ।

ভারত, মিয়ানমারের গরু কম আসার খবরে দেশি গরুর বাজারে বেশ উত্তাপ বয়ে যাচ্ছে। যার আঁচ পাওয়া গেল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন খামারে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, মাঝারি আকারের একটি গরুর দাম এক লাখ টাকার বেশি চাওয়া হচ্ছে। বড় গরু কিনতে হলে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা গুনতে হবে। আর ঢাকার খামারগুলোতে খুব ছোট আকারের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৬০ হাজার টাকারও বেশি। ঢাকার বাইরের হাটগুলোয় ছোট আকারের একটি গরুর দাম ৫০ হাজার টাকার নিচে চাইছেন না বিক্রেতারা।

চাহিদা বেশি থাকায় রাজধানীর খামারগুলোয় গরুতে যত্নের ধরনটাও বেশ আলাদা। প্রতিটি গরুর গলায় সিরিয়াল নম্বর ঝোলানো থাকে। বিশাল শেডের নিচে রেখে একটু শীতল পরিবেশে গরুগুলোকে রাখা হয়। এমন দৃশ্য দেখা গেল বুড়িগঙ্গা নদীঘেঁষা মোহাম্মদপুরের বছিলায় মেঘডুবি অ্যাগ্রো ফার্মে। বিশাল জায়গাজুড়ে দুটি আলাদা শেডে ৯০০ গরু লালনপালন করা হয় এখানে। নজরকাড়া গরুগুলোর দিকে নজর এখানে আরও বেশি দেওয়া হয়। একটু গরম পড়লে কৃত্রিম পদ্ধতিতে পানি ছিটানো হয়। এর সঙ্গে কলা, আখের মতো বিশেষ খাবার তো আছেই। এসব কারণে মেঘডুবি অ্যাগ্রো ফার্মের ৬৫০টি গরু ১৪ আগস্টের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। বাকিগুলো ঈদের আগেই বিক্রির আশা করছেন মেঘডুবি অ্যাগ্রো ফার্মের কর্তাব্যক্তিরা।

গরুর দাম বেশি কি না, তা জানতে চাইলে মেঘডুবি অ্যাগ্রো ফার্মের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারেক মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, আসলে কোরবানির পশু দাম নির্ভর করে এর সৌন্দর্যে। ওজন বা বাজারে মাংসের দামের ওপর নির্ভর করে না। ভারতীয় গরু এলেও ভয় নেই। ভারত থেকে আসা গরুগুলোর বেশির ভাগ রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে। এসব গরু থেকে দেশি গরুগুলোরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই খামারে গরুগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা হয়। পশু চিকিৎসকেরা এগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। রোগাক্রান্ত হলে ওই গরুকে সরিয়ে ফেলা হয়।

২০১৭ সালে দেশে কোরবানির গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪ লাখ। এ বছর এর সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৯ হাজার। এর মধ্যে খামারে হৃষ্টপুষ্ট গরু-মহিষের সংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ ১০ হাজার। গত বছর তা ছিল ২৭ লাখ। তারপরও গরুর দাম চড়া কেন জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক প্রথম আলোকে বলেন, কোরবানির সঙ্গে একটি আবেগের ব্যাপার থাকে। তাই খামারিরা বাড়তি দাম চেয়ে একটি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রতিবছর কোরবানির সময় প্রথম দিকে এই ট্রেন্ড থাকে। কিন্তু খামারিরা এই চড়া দামে গরু বিক্রি করতে পারেন না।

ভারতীয় গরুর কারণে খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কি না। এর উত্তরে হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, ভারত থেকে গরুর আসার পরিমাণ কমে গেছে। এবারও কোরবানির আগমুহূর্তে ভারতীয় গরুর আসার সম্ভাবনা নেই। কারণ, ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা থাকে। এ কারণে অবৈধভাবে গরু সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে পারে না। ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এখন আর ভারতীয় গরু আসার সেই আশঙ্কা নেই।

তবে খামারিদের দাবি, ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে গরু দেশে ঢুকছে। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ভারতীয় গরু কম আসছে। তবে আমাদের কাছে খবর আসছে, সীমান্ত দিয়ে এখনো ভারতীয় গরু দেশে আসছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী দিয়ে বেশি গরু আসছে। প্রতিটি গরুর জন্য মাত্র ৫০০ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। ট্রাকের সংকটের কারণে ভারতীয় গরুগুলো ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে এসব গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাবে। তবে দেশি গরু যেন ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে, সে জন্য আমরা খামারিদের অনুরোধ করেছি।’