ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে সোমবার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারঘোষিত ছুটি ও অবকাশকালে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে আদালতের বিচার কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এ জন্য প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আজ রোববার হাইকোর্ট বিভাগের তিনটি বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে চেম্বার বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. নূরুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়েছে। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে শুধু জামিন-সংক্রান্ত বিষয়সমূহ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে আগামীকাল সোমবার থেকে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম ও নতুন সংযোজন। করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত।
এর আগে গতকাল শনিবার ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এর ফলে অডিও-ভিডিও বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়। অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে আপিল বিভাগ বা ক্ষেত্রমতো হাইকোর্ট বিভাগ সময়ে সময়ে এ বিষয়ে প্র্যাকটিস নির্দেশনা (বিশেষ বা সাধারণ) জারি করতে পারবে। আর জারি করা প্র্যাকটিস নির্দেশনা (বিশেষ বা সাধারণ) সাপেক্ষে অডিও-ভিডিও বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বিচারপ্রার্থী পক্ষগণ বা তাদের আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তি বা সাক্ষীগণের ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিতক্রমে যেকোনো মামলার বিচার বা বিচারিক অনুসন্ধান বা দরখাস্ত বা আপিল শুনানি বা সাক্ষ্য গ্রহণ বা যুক্তিতর্ক গ্রহণ বা আদেশ বা রায় প্রদান করতে পারবে বলেও অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়। এর এক দিনের মাথায় আজ রোববার অনুষ্ঠিত ফুল কোর্ট সভার পর বেঞ্চ গঠনের ওই সিদ্ধান্ত এল।
এর আগে রোববার প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের ৯৩ জন বিচারপতির অংশগ্রহণের ফুল কোর্ট সভা হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ওই অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রুলস প্রণয়ন কমিটির তৈরি করা প্র্যাকটিস ডাইরেকশন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য তৈরি করা প্র্যাকটিস ডাইরেকশন ফুল কোর্ট সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আইনজীবীরা কীভাবে মামলা করবেন, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কীভাবে শুনানিতে অংশ নেবেন, সেসব ব্যবহারিক বিষয়ে কয়েক দফা নির্দেশনা রয়েছে।
হাইকোর্টের তিন বেঞ্চ, বসবেন চেম্বার আদালত
আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. বদরুল আলম ভূঞা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রামণ রোধকল্পে এবং শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে সাধারণ ছুটিকালীন ও আপিল বিভাগের অবকাশকালীন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০’ এবং এই কোর্ট কর্তৃক জারিকৃত প্র্যাকটিস ডাইরেকশন অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে আপিল বিভাগের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য চেম্বার জজ হিসেবে বিচারপতি মো. নূরুজ্জামানকে প্রধান বিচারপতি মনোনয়ন প্রদান করেছেন। বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ১৪ ও ২০ মে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে চেম্বার কোর্টে শুনানি গ্রহণ করবেন।
অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান ভূইয়া স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য, দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে এবং শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে সাধারণ ছুটিকালীন ও হাইকোর্ট বিভাগের অবকাশকালীন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই অধ্যাদেশ এবং এই কোর্ট কর্তৃক জারি করা প্র্যাকটিস ডাইরেকশন অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য প্রধান বিচারপতি নিম্নরূপ বেঞ্চগুলো গঠন করেছেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান অতিজরুরি সব ধরনের রিট ও দেওয়ানি মোশন এবং তৎসংক্রান্ত আবেদনপত্র গ্রহণ করবেন। অতিজরুরি সব ধরনের ফৌজদারি মোশন এবং তৎসংক্রান্ত জামিনের আবেদনপত্র গ্রহণ করবেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার সাকশেসন আইন, অ্যাডমিরালিটি কোর্ট আইন, ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ কয়েকটি আইনের অধীনে আবেদনপত্র গ্রহণ ও আপিল শুনানি গ্রহণ করবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। তবে এতে আদালতের সময়সূচি উল্লেখ নেই।
অধস্তন আদালতে শুধু জামিন শুনানি
এদিকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে জরুরি জামিন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে ছুটিকালীন আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রসঙ্গে বিজ্ঞপ্তি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য, ‘নির্দেশিত হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, দেশব্যাপী করোনাভাইরাস রোগের সংক্রমণ মোকাবিলায় এবং এর ব্যাপক বিস্তার রোধ কল্পে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৬ মে পর্যন্ত সকল আদালতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ছুটির সময়ে (সাপ্তাহিক ও সরকারি বর্ষপঞ্জিতে ঘোষিত ছুটি ছাড়া) বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলার জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর এলাকার মহানগর দায়রা জজ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, বিশেষ জজ, শিশু আদালতের বিচারক, সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারককে এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজে অথবা তার নিয়ন্ত্রণাধীন এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০ এবং উচ্চ আদালতের জারি করা “বিশেষ প্র্যাকটিস নির্দেশনা” অনুসরণ করে শুধু জামিন-সংক্রান্ত বিষয়সমূহ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’ এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।