ভিটামিনের নামে বিক্রি হচ্ছে ক্ষতিকর ওষুধ
আমদানি ও ব্যবহারনিষিদ্ধ পরিপূরক খাদ্য (ফুড সাপ্লিমেন্ট) অবাধে বিক্রি হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন ফার্মেসিতে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল, ডায়াবেটিক হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসকেরা রোগীর ব্যবস্থাপত্রেও এগুলোর নাম লিখছেন। কমিশন-বাণিজ্যের কারণে একশ্রেণীর চিকিৎসক এমনটি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, এসব পরিপূরক খাদ্য (ভিটামিনজাতীয় ওষুধ) ব্যবহারের বৈধতা নেই। পাশাপাশি এগুলোর বেশির ভাগই শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওষুধের দোকানগুলোতে এমটিএল প্লাস, নিম গোল্ড, জেড-বোন, ক্যাল-ভি, উনডার জয়েন্ট, সি-এম-ডি, এইচ পি ওল্ড, এইচ পি-ক্যাল, ভ্যালিন, বিগসুপার, এস-সিলভার, বোন সলিডসহ আরও বিভিন্ন ভিটামিন বড়ি বিক্রি হচ্ছে। এসব ওষুধের গায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে তৈরি বলে উল্লেখ আছে। ১৫ থেকে ২৫টি বড়ি বা ক্যাপসুলের প্রতিটি কৌটার দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, এগুলোর বেশির ভাগই ভুয়া। ঢাকার মিটফোর্ডের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থানে নিম্নমানের স্বল্পমূল্যের ভিটামিনের কৌটায় ভরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নাম দিয়ে বাজারজাত করছে। আর কমিশন-বাণিজ্যের কারণে চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্রে এসব ওষুধ লিখছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক আয়েশা জুলেখা, মো. সোবহান, সেবা ক্লিনিকের পরিচালক ময়েজ উদ্দীনসহ আরও কয়েকজন চিকিৎসক এসব ওষুধ নিয়মিত ব্যবস্থাপত্রে দিয়ে থাকেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাফর আহমেদ বলেন, এসব নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাতের জন্য মূলত চিকিৎসকেরা দায়ী। ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকেরা ওষুধগুলো লেখেন বলেই দোকানদারেরা এসব রাখছেন। তবে অনেক সচেতন ওষুধ ব্যবসায়ী রোগীকে এগুলো না কেনার জন্য বলেন। কিন্তু রোগীরা চিকিৎসকের কথার বাইরে কিছু শুনতে চান না।
ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, কিছু সচেতন ব্যবসায়ী এসব ওষুধ বিক্রি করেন না। এর আগে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের কাছে এই ওষুধ বিক্রি বন্ধের আবেদন জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এর পরও এগুলোর বিক্রি বন্ধ হয়নি।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট-জাতীয় ওষুধ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি এগুলোর ব্যবস্থাপত্রও দিই না।’
চিকিৎসক দুরুল হোদা, ময়েজ উদ্দীন ও সোবহান ব্যবস্থাপত্রে এসব ওষুধ লেখার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা জানান, বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব ওষুধের গুণাগুণ বর্ণনা করেন। এগুলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ বলেও জানান বিক্রয় প্রতিনিধিরা। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা ওষুধ। অপুষ্টিতে ভোগা কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লেখা হয়। ঢালাওভাবে নয়। তবে এগুলো আসলেই বিদেশ থেকে আমদানি বা বৈধ কি না, তা জানা নেই। এগুলো দেখার দায়িত্ব ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের।
এ ব্যাপারে জেলা ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক শিকদার কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব ওষুধের আমদানি নিষিদ্ধ। এগুলোর কোনো নিবন্ধন নেই। ড্রাগ নম্বরও নেই। ওষুধ ব্যবসায়ীদের এগুলো বিক্রি করতে নিষেধ করেছি। সম্প্রতি এক ওষুধ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিছু ওষুধ জব্দ করেছি। এগুলো অনেক নিম্নমানের। দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমেরিকায় তৈরি লিখে কিছু ভুয়া কোম্পানি ওষুধ বাজারজাত করছে।’
সিভিল সার্জন এ কে এম মোজাহার হোসেন বলেন, ব্যবস্থাপত্রে এগুলো দেওয়া উচিত নয়। খোঁজখবর নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।