ভেঙে ফেলা হচ্ছে আজমেরী ওসমানের সেই টর্চার সেল

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলটি (নির্যাতন কেন্দ্র) ভেঙে ফেলা হচ্ছে। মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গত আগস্টে এই টর্চার সেলে অভিযান চালায় র‌্যাব। তখন সেখান থেকে নির্যাতনের শিকার এক ব্যক্তির রক্তাক্ত জিনসের প্যান্ট, রক্তমাখা গজারির লাঠি ও বস্তাভর্তি নাইলনের রশি উদ্ধার করা হয়।
শহরের আল্লামা ইকবাল রোডে অবস্থিত আজমেরী ওসমানের টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত স্থাপনার মালিক সাজেদুল হক জানান, প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর স্থাপনাটি তিনি পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন। এখানে তিনি রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস কারখানা করেছিলেন। ২০০০ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। কারখানার সামনের অংশে গুদাম হিসেবে ব্যবহূত টিনশেড স্থাপনাটি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আজমেরীর বন্ধু রাজীব মাসিক ১৭ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। তাঁদের সঙ্গে চুক্তি গত নভেম্বরে শেষ হয়। এখন এই জমিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে।
র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা গত ৭ আগস্ট এই টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে রক্তমাখা জিনসের প্যান্ট, রক্তাক্ত গজারির লাঠি ও বস্তাভর্তি নাইলনের রশি উদ্ধার করেন। তাঁরা ঘরের দেয়াল ও শোকেসে অনেক গুলিবর্ষণের আলামত পান। অভিযানকালে র‌্যাব সদস্যরা সাংবাদিকদের জানান, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তের অংশে হিসেবে তাঁরা এই অভিযান চালান। পরবর্তী সময়ে ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতে তিনি বলেন, গত ৬ মার্চ ত্বকীকে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে এই টর্চার সেলেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ভ্রমরের জবানবন্দির পর আজমেরী ওসমান ও তাঁর ক্যাডাররা আত্মগোপন করেন। সম্প্রতি নাসিম ও শামীম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর আজমেরী ওসমানের ক্যাডারদের আবারও শহরে দেখা যাচ্ছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আজমেরী ওসমান কলেজ রোডে এই টর্চার সেল গড়ে তোলেন। টর্চার সেলের বাইরে সাইনবোর্ড লাগানো হয় ‘উইনার ফ্যাশন’। টর্চার সেলের পাশেই সরকারি তোলারাম কলেজ। কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও ভিপি পরিচয়দানকারী মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে টিটু মূলত এই টর্চার সেলের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর উপস্থিতিতে ও তত্ত্বাবধানে টর্চার সেলের সামনের রাস্তায় পর পর ছয়টি গতিরোধক নির্মাণ করা হয়। রাস্তায় লোহার ব্যারিকেড এমনভাবে দেওয়া হয় যেন ব্যারিকেডের নিচ দিয়ে শুধু রিকশা ও আজমেরী ওসমানের জিপ চলাচল করতে পারে। মূলত র‌্যাব-পুলিশের পিকআপ ভ্যান দ্রুত এসে যাতে টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে না পারে, সে জন্যই এই গতিরোধক ও লোহার ব্যারিকেড নির্মাণ করা হয়। টর্চার সেলের সামনের রাস্তায় বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে বিদ্যুতের অবৈধ সরবরাহ নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি ফ্লাড লাইট বসানো হয়। একাধিক সিসি ক্যামেরা দ্বারা টর্চার সেলের দুই পাশের রাস্তায় পথচারী ও যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হতো।
ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, ত্বকীকেও এই টর্চার সেলে খুন করা হয়েছে। আমরা আজমেরী ও শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান পরিচালিত ছয়টি টর্চার সেলের বিবরণ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় এপ্রিলে জিডি করি। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন তখন এসব টর্চার সেল ভেঙে দেয়নি। পরবর্তীকালে আজমেরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভ্রমর আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, তাতে কলেজ রোডের টর্চার সেলের প্রসঙ্গটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’