ভোলা খালের জন্য গোপন কান্না!

ধান–চালের আড়তের সামনে​ ভোলা খালে পণ্যবাহী নৌযান। খালের অন্য পাশে ভোলা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
ধান–চালের আড়তের সামনে​ ভোলা খালে পণ্যবাহী নৌযান। খালের অন্য পাশে ভোলা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো

ভোলা শহর অন্য যেকোনো জেলা শহরের তুলনায় পরিচ্ছন্ন। ঢাকার মতো রাস্তার ধারে ঝুলন্ত বিন (ময়লার পাত্র) সেই শহরেও আছে। সেগুলো ঢাকার চেয়ে কয়েক গুণ ভালো। স্টেইনলেস স্টিলের সেই বিন মানুষ ব্যবহারও করে পুরোদমে। রাস্তার পাশের দোকান বন্ধের পর দোকানিকে ঝাড়ু দিয়ে ময়লা গুছিয়ে রাখতে দেখা গেছে বেশ কয়েক জায়গায়। শহুরে দুর্গন্ধ খুব একটা নাকে লাগে না। রাস্তায় বের হওয়া ব্যক্তিগত গাড়ি হাতে গোনা যাবে।
ভোলা কাঁচাবাজার, আড়ত এলাকা—এগুলোও মোটামুটি পরিচ্ছন্ন। শহরটির এই ভালো থাকার মূলে আছে ভোলা খাল। জোয়ার-ভাটার টানে সব আবর্জনা দূর করে সে এই শহরকে এখনো পরিচ্ছন্ন রাখছে। সদর রাস্তার সমান্তরালে শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এমন একটা খাল যেকোনো শহরের জন্য বিরাট আশীর্বাদ। আধা ডজন কার্গো নৌকা শহরের মাঝখানে আড়তের সামনে মালামাল নিয়ে হাজির হওয়ার দৃশ্য নতুন আসা যেকোনো মানুষকে আকর্ষণ করবে। আর এই সুবিধা আছে বলেই ভোলা শহরে মালামাল নিয়ে ট্রাক ঢুকতে হয় কম। যানজট লাগে না। পরিবহন খরচ কম বলে পণ্যের দাম কম থাকে। হরতাল-অবরোধেও নিত্যপণ্য সংকট হয় না।
কিন্তু যাঁরা ভোলা শহরে বসবাস করেন, তাঁরা এই ভালোতে সন্তুষ্ট নন। ভোলা খালের অতীত দেখে আসা এই মানুষেরা এই খাল আর ভোলা শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। ভোলার বাকি সব বাদ দিয়ে শুধু খালটি নিয়ে লেখার জন্য নানা পেশার লোকেরা এই প্রতিবেদককে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, ভোলা খালের করুণ দশা দেখে তাঁদের বুক ফেটে যাচ্ছে। এই খালের ওপর যেসব নাগরিক আয়োজনের আলামত শুরু হয়েছে, তাতে তাঁরা গুমরে মরছেন। কিন্তু শব্দ করে কান্নার সাহস নেই। খালটি কাগজে-কলমে ভোলা পৌরসভার।
১৬২৮ সালে প্রকাশিত রোহিনী কুমার সেনের ইতিহাসগ্রন্থ বাকলায় যেটি বেতুয়া নদী, সেটিই এখন ভোলা খাল। পূর্বে প্রমত্তা মেঘনা ও পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদীর সংযোগকারী বেতুয়ার বুকজুড়ে গড়ে উঠেছিল ভোলা শহর।
ভোলা সদর উপজেলার চর ভেদুরিয়া থেকে শিবপুরের স্লুইসগেট পর্যন্ত বর্তমান ভোলা খাল। শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই খাল থেকে অন্তত ১০টি শাখা দুই পাশের পশ্চিম ইলিশা, বাপ্তা, কাচিয়া, আলীনগর, চরসামাইয়্যা, ধনিয়া ও শিবপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করেছে। বোরোর সেচে এসব শাখা খালের পানি মূল ভরসা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খাতায় ভোলা খালের মূল অংশ প্রায় ১২ কিলোমিটার। এর ৪ কিলোমিটার সচল, ৮ কিলোমিটার অচল। শাখা-প্রশাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। আশির দশকে পাউবো একবার খালটি খনন করেছিল। ছোটবেলায় এই খাল দিয়ে জেলার সর্ব দক্ষিণের চরফ্যাশন উপজেলা পর্যন্ত যাওয়ার স্মৃতি আছে নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক মো. শাজাহানের।
ঢাকা-বরিশালের লঞ্চগুলো নিকট অতীতে এ খাল দিয়ে ভোলা শহরে ঢুকত। এখন এসব লঞ্চ ভেড়ে খেয়াঘাটে; শহর থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে শহরে রিকশা ভাড়া ৬০ টাকা।
এখন মালবাহী কার্গো বর্ষাকালে খেয়াঘাট থেকে কাঁচাবাজারের থাকথাক (সিঁড়ি) পুল পর্যন্ত আসতে পারে। শীতকালে সরকারি বালক বিদ্যালয় পর্যন্ত। এরপর থেকে শিবপুর স্লুইসগেট পর্যন্ত (ভোলা খালের মাথা) ৮ কিলোমিটারে কোনো ধরনের নৌকা চলাচল করতে পারে না। এর অন্যতম কারণ খালটি খনন না করা। আর আছে সেই বন্ধ স্লুইসগেট, যার কারণে জোয়ার-ভাটা খেলতে পারে না পুরো খালে। তবে সব ছাড়িয়ে শহরবাসীর আলোচনায় স্থান পেয়েছে মাঝখানটা উঁচু থাকথাক পুল ভেঙে পাড়ের সমান্তরালে ‘কালভার্ট’ তৈরি করা। এই কালভার্ট নিচু হওয়ায় এবং পলি জমে খালের তলা ভরে যাওয়ায় ভবিষ্যতে নৌকা চলাচলের স্বপ্নও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তবে অনেকে মনে করেন, খালটি খনন করলে এ অংশে ছোট নৌকা চলাচল করতে পারবে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভোলা খালের অচল হয়ে পড়া অংশে পৌরসভা একসঙ্গে আরও কয়েকটি নিচু সেতু বানাচ্ছে। অন্তত তিনটি সেতুর কাজ চলছে। নাগরিকদের কেউ কেউ এগুলোকে ‘অহেতুক সেতু’ বলছেন। এর ওপর দিয়ে রিকশাসহ ছোট গাড়ি চলাচল করতে পারে। থাকথাক পুল দিয়ে কেবল মানুষ পারাপার হতে পারত।
ভোলার ব্যবসায়ীরা এ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন? জেলা মুদি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. বাবুল বললেন, এই খালকে কেন্দ্র করেই ভোলার ব্যবসা-বাণিজ্য। এখন নৌযান শহরে ঢুকতে না পারায় দূরে পণ্য খালাস করে ট্রাক বা ভ্যানে করে আনতে হয় আড়তে। এতে প্রতি টন পণ্যে ৫০ থেকে ৭০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ছে এবং তা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়ে চাপছে।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ রহমান অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র গোলাম নবী আলমগীরের মতে, ‘ব্যবসায়ীরা যাতে পণ্য নিয়ে আগের মতো আড়তের সামনে আসতে পারেন, সে চেষ্টা আমাদের সবাইকে করতে হবে। নিচু সেতু করা বাদ দিয়ে উঁচু সেতু করতে হবে, যাতে অনায়াসে নৌযান চলতে পারে। না হলে একসময় এটা দুর্গন্ধময় ডোবায় পরিণত হবে। বাজারে, শহরে আগুন লাগলে নেভানোর পানিও পাওয়া যাবে না।’
ভোলা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন অবশ্য ততটা হতাশ নন। তিনি বললেন, ‘আমরা খাল খনন করার উদ্যোগ নিয়েছি। শুধু ভোলা খাল নয়, পৌরসভার ভেতরের সব খালে শিগগির খনন শুরু হবে।’ নিচু সেতুর কারণে কি নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে না? তাঁর সোজা জবাব, মালবাহী বড় নৌকা থাকথাক পুল পর্যন্তই চলবে। সে জন্য খনন ও উচ্ছেদ করা হবে। গত ২০ বছর এর বেশি তো কোনো নৌকা যায়নি!
পৌরবাসী আর পৌরসভায় মতের পার্থক্যের জায়গাটা ঠিক এখানেই। খাল বাঁচানোর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বললেন, ‘আমরা চাই খালের অচল অংশে আবার নৌকা চলাচল করুক। তার জন্য খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ—সব করা হোক। পৌরসভা যেন হাল ছেড়ে না দেয়।’
খাল রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত আছেন অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব অব ভোলার আহ্বায়ক এস এম বাহাউদ্দিনও। তিনি বললেন, ‘আমরা চাই সংশ্লিষ্টরা এটুকু বুঝুন যে ভোলার ভবিষ্যৎ এককভাবে রাস্তা বা সেতুতে নয়। ভোলার সুস্থতার জন্য পুরো ভোলা খালকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে। এটা এখন যতটা সম্ভব, পরে ততটাই অসম্ভব হয়ে যাবে।’
এটা না হলে কী হবে, তার চিত্রও সবার মুখে মুখে। চালকলের চিটা-ছাই, স মিলের ভুসি, কসাইপট্টিসহ বাজারের যাবতীয় বর্জ্য, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষাক্ত বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা—সবকিছুতে ভরে যাবে খাল। আস্তে আস্তে তা শহুরে নালায় পরিণত হবে। এখন জানুয়ারি থেকে তিন মাস শহর যে পূতি দুর্গন্ধময় হয়ে থাকে, তখন তা থাকবে সারা বছর। মশা-মাছিতে ভরে যাবে। সরু রাস্তায় ঢুকবে মালবাহী ট্রাক, ভ্যান। লাগবে যানজট। ধোঁয়া-ধুলা, হইচই, জলাবদ্ধতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এর সবটুকু ভোগ করতে হবে পৌরবাসীকে।
ভোলা খাল সরু হয়ে গেছে ওবায়দুল হক বাবুল মোল্লা সেতু থেকে ভোকেশনাল পর্যন্ত। খালটির দুই পাশে ১০৬টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছে সদর উপজেলা ভূমি অফিস। এসব সরিয়ে খাল রক্ষার জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
নাগরিকদের দাবি, মেঘনার গোড়ায় স্লুইসগেটটি সপ্তাহে বা মাসে দু-একবার খুলে দিয়ে খালে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে পাউবোকে। তাতে খাল পরিষ্কার থাকবে, পলি জমবে না। কিন্তু বন্ধ থাকতে থাকতে স্লুইসগেটটি এখন অকেজো। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী বাবুল আক্তার বললেন, ‘স্লুইসগেট সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে।’
গুগল আর্থে ভোলা শহরের মানচিত্রকে অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত কম্বলের মতো লাগে। মানচিত্রের ছিদ্রগুলো আসলে পুকুর। ভোলায় প্রতি বাড়ির সামনেই আছে ছোট ছোট পুকুর। আছে পাইপ লাগিয়ে বালু ফেলে পুকুর ভরাটের তোড়জোড়ও। কারণ, ভোলায় জমির দাম অনেক। ভোলা খালের বিপদও এখানেই। উদ্ভট নগরায়ণ আর অপরিকল্পিত অর্থপ্রবাহের তোড়ে যেন ভোলা খাল আশীর্বাদ থেকে অভিশাপে রূপ না নেয়।