ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড রক্তক্ষরণে বাধা দেয়। প্রসবের তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রসূতিকে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড দিতে পারলে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ। প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ রোধে দেশে এই ওষুধের ব্যবহার তেমন নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্য কাটাছেঁড়া বা অস্ত্রোপচারে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হলেও প্রসবের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। গবেষণায় যেহেতু কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেহেতু প্রসবের ক্ষেত্রেও এটা ব্যবহার করা যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত, ব্যবহারবিধি ঠিক করে দেওয়া।’ মাতৃমৃত্যুর হার বেশি এশিয়া ও আফ্রিকার এমন ২১টি দেশে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিডের কার্যকারিতা পরীক্ষা বা ট্রায়াল করা হয়। ১৬ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী ২০ হাজার নারীর ওপর ২০১০ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গবেষণাটি চালানো হয়। গবেষকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘ওয়ার্ল্ড ম্যাটারনাল অ্যানটিফাইব্রিনোলাইটিক’ ট্রায়াল। গবেষণাটি সমন্বয় করে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন।
গবেষণার আওতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩২৫ জন প্রসূতিকে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড দেওয়া হয়। এই গবেষণা দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির পরিচালক কাউসার আফসানা। তিনি বলেন, মাতৃমৃত্যু কমাতে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ল্যানসেট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়েই মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২০ কোটির বেশি নারী গর্ভবতী হন। তাঁদের মধ্যে এশিয়া আর আফ্রিকাতে কেবল রক্তক্ষরণেই ১৮ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সন্তান প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি মায়ের ৫০০ মিলিলিটার বা বেশি রক্তক্ষরণ হয়, প্রাথমিকভাবে একে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ বলে ধরা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঘটনা সন্তান প্রসবের পরপরই ঘটে। গবেষণাটি বলছে, ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড প্রয়োগের ক্ষেত্রে সময় গুরুত্বপূর্ণ। রক্তক্ষরণ শুরুর পর যত দ্রুত এটা দেওয়া যাবে, তত বেশি কার্যকর হবে। ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় দেওয়া হয়। এটি রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা যায়, ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড দেওয়ায় রক্তক্ষরণে ১৯ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর ঘটনা কমেছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, প্রসবের তিন ঘণ্টার মধ্যে ইনজেকশন প্রয়োগ সম্ভব হলে মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব। মা ও শিশুর ওপর ট্রানেক্সামিক অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব নেই। কাউসার আফসানা বলেন, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিডের কার্যকারিতা নিয়ে অল্প পরিসরে গবেষণা করে দেখা যেতে পারে।