ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, গাবতলী, আমিনবাজার, মিরপুর ১২, আবদুল্লাহপুর, মহাখালী, তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজার এলাকাকে পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় পাঁচটি সড়কে আবার অবৈধ পার্কিং ফিরে এসেছে। দুটি সড়কের কিছু অংশ দখল করে গাড়ি পার্ক করা হচ্ছে। দুটি সড়ক গতকাল গিয়ে পার্কিংমুক্ত পাওয়া গেছে। যদিও এর একটি মহাখালী গত সপ্তাহে পার্কিংয়ের কবলে ছিল। প্রথম আলোয় এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর কদিন ধরে তা পার্কিংমুক্ত আছে। সড়কগুলো আবার পার্কিংমুক্ত করতে বিশেষ অভিযান চালাবে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

পার্কিংমুক্ত ঘোষিত মিরপুর ১২ নম্বর ও আবদুল্লাহপুর এলাকায় অবৈধ পার্কিং পুরোপুরি ফিরে এসেছে। মিরপুর ১২ নম্বরে তিন লেনের সড়কের দুই লেনই দখল করে রাখা হচ্ছে বিভিন্ন পরিবহনের বাস। আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে চালকেরা দীর্ঘ সময় বাস থামিয়ে যাত্রী তুলছেন। ফলে অপ্রশস্ত হয়ে পড়া সড়ক দিয়ে যান চলাচল করায় যানজট তৈরি হচ্ছে।
গতকাল বুধবার মিরপুর ১২ নম্বর এলাকা সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর ১২ নম্বরের হারুন মোল্লা ঈদগাহ মাঠের সামনের অংশে পার্কিং করে রাখা হয়েছে মিরপুর-যাত্রাবাড়ী পথে চলাচলকারী শিখর পরিবহনের বেশ কিছু গাড়ি। ঈদগাহ মাঠের দুই পাশে পার্কিং করা হয়েছে শিখর, বিহঙ্গ, ইউনাইটেড পরিবহনের ২৩টি বাস। কিছু দূর এগিয়ে ঢাকা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেইনিং স্কুলের সামনে সড়কে দুই লেন দখল করে বিহঙ্গ পরিবহনের সাতটি আর ইউনাইটেড পরিবহনের পাঁচটি বাস রাখা হয়েছে।
হারুন মোল্লা ঈদগাহ মাঠের সামনে থেকে বিআরটিসি দ্বিতল বাস ডিপো হয়ে মিরপুর সিরামিক সড়কের সিরামিক গেটের বিপরীতে অবস্থিত পানির ট্যাংকি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশে দেড় শতাধিক বাস ও গাড়ি পার্ক করা।
শিখর পরিবহনের চালকের সহকারী বাবু মিয়া বলেন, ‘গাড়ির কিছু কাজ করাব। তাই এখানে রেখেছি।’ কতক্ষণ রাখবেন জানতে চাইলে বাবু বলেন, ‘আজকে সারা দিন এখানেই আছি। গাড়ির মিস্ত্রি এখনো আসেনি।’
বিহঙ্গ পরিবহনের চালক মো. হাসেম আলী বলেন, ‘আমগো ট্রিপ এইহানে শেষ, আবার নতুন ট্রিপ ধরুম। কিন্তু এহন দুপুইরা খাওনের লাইগা গাড়ি থামাইসি।’ রাস্তায় গাড়ি রাখার কারণে সড়ক সরু হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এহন দুপুর, তাই গাড়ি দেখতাসেন। এমনি এহানে গাড়ি থাকে না।’
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের ফুটপাতে পরিবহন কোম্পানিগুলোর কাউন্টার। তাই নিয়মিতই এখানে ১৫-২০টি গাড়ি থেমে থাকে এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পরিবহনশ্রমিকদের কেন্দ্র করে ফুটপাতে গড়ে উঠেছে কিছু খাবারের ও গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মিরপুর ১২ নম্বর সিরামিক ওয়ার্কস সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনের অংশ থেকে সিরামিক গেটের পানির ট্যাংকি পর্যন্ত। এই অংশে দিনের পর দিন সড়কের একটি লেন পুরোপুরি দখল করে রাখা হচ্ছে যাত্রীবাহী বাস। কিছু মেরামতের জন্য, কোনোটির খানিক বিশ্রাম। দেখা যায়, স্বাধীন পরিবহন, খাজাবাবা, ল্যামস, বিহঙ্গ, আকিক, রবরব, শিখর পরিবহনের বাসগুলো রাস্তায় পার্কিং করে রাখা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনির খান বলেন, এই রাস্তা এখন পুরোপুরি বাস টার্মিনাল। অর্ধশতাধিক বাস রাস্তায় সব সময় পার্কিং করা থাকে। তিনি সড়কে রাখা খাজাবাবা পরিবহনের একটি বাস দেখিয়ে বলেন, ‘এই গাড়ি তিন দিন ধরে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।’
ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিটন কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, মিরপুর ১২ নম্বর সিরামিক রোডে গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো অনুমতি নেই। পরিবহন মালিকেরা এক লাইনের পার্কিংয়ের অনুমতি চেয়েছিল। অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখলে সঙ্গে সঙ্গে রেকারিং করা হয়। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
আবদুল্লাহপুর: আবদুল্লাহপুর এলাকা সরেজমিনে দেখা যায়, আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের উত্তরা ফিলিং সিএনজি স্টেশনের সামনে টাঙ্গাইল জেলার কয়েকটি বাস মূল সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। মিরপুর-আবদুল্লাহপুর রুটের বাসগুলোও স্লুইসগেট এলাকায় যাত্রী তুলছিল। আশুলিয়া, বাইপাইল, জিরাবো ও সাভারের বাসগুলো খুঁটি গেড়েছে মূল সড়কে। সড়কটাই যেন বাস টার্মিনাল।
খুব কাছাকাছি থাকা চারটি ফিলিং স্টেশন—খন্দকার, উত্তরা, আরএসআর এবং তাসিম সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা প্রাইভেটকারের সারিও মূল সড়কে গিয়ে ঠেকেছে। উত্তরা এবং আরএসআর ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা প্রাইভেটকারগুলো মূল সড়কের দুটি লেন দখল করে নিয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরা ফিলিং সিএনজি স্টেশনের পাশে ফুটপাতে গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গগামী বাসের কাউন্টার। সেখানে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে মাদারগঞ্জের ক্রাউন ডিলাক্স, কুড়িগ্রামের বোরাক, রাজশাহীর নাহার এন্টারপ্রাইজ, বগুড়ার আজিজ ট্রাভেলস পরিবহনের বাসগুলোকে যাত্রী তুলতে দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের বৃষ্টি, আদর, নিউ বোরাক, মায়ের আঁচল, লাকী, সোনালী, কাকলী, আল ইমরান, বিসমিল্লাহ, সাহানা, মহানগর প্রভৃতি পরিবহন কোম্পানির আরও বেশ কিছু কাউন্টার ফুটপাতে আছে। এগুলো মূল সড়কে গাড়ি রেখেই যাত্রী ওঠানোর কাজটি সারছে।
আবদুল্লাহপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আফজাল হোসেন বলেন, আবদুল্লাহপুরে যানজটের প্রধান কারণ যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না বাসচালকেরা। পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কিছু হলেই ঝামেলা করেন।
আবদুল্লাহপুরে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসগুলো সরাতে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। এ বিষয়ে আবদুল্লাহপুরের ট্রাফিক সার্জেন্ট আবদুল হান্নান বলেন, সকাল ও বিকেলে গ্যাস নিতে আসা গাড়ির দুটি লাইন করতে দেওয়া হয় না। তবে এখানে পাশাপাশি এতগুলো সিএনজি স্টেশনের অনুমতি দেওয়াটা ভুল। দূরপাল্লার বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকনেতারা এখানে যাত্রী তোলার অনুমতি দিয়েছেন।