মীরকাদিমের নামে চলছে হরিয়ানা
মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর সেতু পার হতেই বৃষ্টির তেজ আরও বেড়ে গেল। শ্রাবণবেলায় প্রমত্তা ধলেশ্বরীর পাড় ঘেঁষে পিচঢালা সড়কটি বৃষ্টির পানিতে এখন অনেক স্বচ্ছ। এই পথ ধরেই গত সোমবার সকালে যেতে হয়েছে মীরকাদিমের দিকে। ছোট একটি পৌর এলাকা। কিন্তু বেশ খ্যাতি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলের কমলাঘাট নৌবন্দর। বন্দরটি ঘিরে অসংখ্য চাল, তেল, ডালের মিল, মাছের বাজার, মিষ্টি, উর্বর জমি—আরও কত–কী! তবে এখানকার নজরকাড়া ধবধবে সাদা গরু মীরকাদিম এলাকাটিকে আরও বিখ্যাত করেছে।
মীরকাদিমের গাই গরুর চোখের পাপড়ি সাদা, মাথার শিং সাদা, নাকের সামনের অংশ মাজল সাদা, পায়ের খুর সাদা, লেজের পশম সাদা, আর সারা শরীর তো সাদাই। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে মীরকাদিমের গরু বিক্রি একটি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। ঢাকার নবাব গণি মিয়ার সময় থেকেই রহমতগঞ্জে চালু হওয়া গরুর হাটে উঠত এই বিশেষ গরু। এখনো শুধু এ হাটেই এর দেখা মেলে।
মীরকাদিমের কমলঘাট বন্দরের সঙ্গেই রয়েছে রিকাবি বাজার। এই বাজারে তেলের মিলের মালিক ছিলেন লুৎফর রহমান। ৭০ বছর ছুঁই ছুঁই এই প্রবীণ মানুষটি অবসর সময় কাটে তাঁর ছেলে ভেটেরিনারি চিকিৎসক মাহমুদুর রহমানের শায়েলা ফার্মেসিতে। মীরকাদিমের গরু এত বিখ্যাত হওয়ার কাহিনি শোনালেন এ বৃদ্ধ। বললেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন তেল, চাল, ডাল কিনতে। এখানকার সাদা গরুও তাঁদের নজর কাড়ে। সেই থেকে মীরকাদিমের গরু কেনার ঝোঁক শুরু হয়।’
গরু কেনার বা আকর্ষণের একটি কারণও রয়েছে। এখানকার গরুর ব্যবসায়ী আরিফুর রহমানের কাছ থেকে জানা গেল সে কথা। তিনি বলেন, কোরবানির ঈদের জন্য মীরকাদিমের গরুগুলোকে আলাদা করা হতো। নিজেদের খামারে কেবল খইল, বুট, খেসারি, গম ও মসুর ডালের ভুসি খেতে দেওয়া হতো। সঙ্গে ভুট্টা চূর্ণ করে দেওয়া হতো। কোনো ঘাস খাওয়ানো হতো না। তাই মীরকাদিমের গরুর মাংসে আঁশ কম থাকে। মাংস একটু নরম ও তেলতেলে হয়। এ কারণে এখানকার গরুর লালন-পালনে খরচ বেশি। তাই দামও অন্যান্য গরুর চেয়ে বেশ বেশি।
তবে মীরকাদিমের গরুর সেই সুদিন আর নেই। আরিফুর রহমান বলেন, ‘এখন গোখাদ্যের দাম বেশি, গরু লালন-পালনে জায়গা কম, ভারতীয় গরু বাজারে চলে আসায় মীরকাদিমের ধবলরঙা গরুর প্রতি খামারিদের ঝোঁক-আগ্রহ কমে গেছে।’
আরিফুর রহমান নিজে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ২৫-৩০টি ধবল গাই গরু পালতেন। লাভ কমে যাওয়ায় পেশা বদল করে এখন মুরগির ব্যবসা করছেন।
আরিফুর রহমানের মতো অনেক গরুর খামারি পেশা বদল করেছেন। অনেকে আবার পাড়ি দিয়েছেন অন্য জায়গায়। এই এলাকার সম্ভ্রান্ত কৃষকেরা ধবল গাই পালতেন, ঈদের সময় বিক্রি করতেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর হাজি, সইজউদ্দিন হাজি, কালা মিয়া হাজি, কালু-নকলু নামে দুই ভাই, সলু মাতবর, তৈয়ব আলী। এঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। তাঁদের বংশধরেরা পেশা বদল করে চলে গেছেন মীরকাদিম ছেড়ে। মীরকাদিমের গরুর জায়গা এখন নিয়ে নিয়েছে হরিয়ানার গরু।

যেভাবে এল হরিয়ানার গরু: গরু পালনে আগ্রহ কমে যাওয়ায় মীরকাদিমে সংকট দেখা দেয় ধবল গরুর। স্থানীয় লোকজন এ ধরনের গরুকে ‘হাসা গরু’ বলে ডাকেন।
হাসা গরুর সন্ধানে এখন খামারিরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যান। কেউ যান ফরিদপুরে, কেউ দেশের দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায়। শেষমেশ উপায় না পেয়ে যান ঢাকার গাবতলীর গরুর হাটে। সাদা রঙের গরু কিছুটা বাড়তি দামে কিনে আনা হয় মীরকাদিমে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের চার মাস আগে এ ধরনের গরু কিনে লালন-পালন করেন তাঁরা। বেশির ভাগই ছোট খামারি। খামারি বলা হলে ভুল হবে। এঁরা আসলে সকালে মাছের আড়তে কিংবা কোনো মিল-কারখানায় কাজ করেন। কাজ শেষে গরু লালন-পালন করেন। তবে গরু পালনে পুরোনো রীতি অনুসরণ করেন তাঁরা। ঘাস-লতাপাতা একেবারেই দেন না গরুগুলোকে। কেবল ভুসি, জাউ, ভুট্টা।
নদীগির পাথর এলাকার ছোট খামারি আনোয়ার হোসেনও চার মাস আগে ৮০ হাজার, ৭০ হাজার ও ৬০ হাজার টাকায় তিনটি সাদা ‘হাসা গরু’ কিনেছেন ফরিদপুর জেলার একটি হাট থেকে। সবই হরিয়ানা জাতের। ছোট্ট একটি গরু ২৫ হাজার টাকায় চার মাস আগে কিনেছেন তিনি। বড় তিনটি এবারের কোরবানির ঈদে বিক্রি করবেন। ছোট গরুটি বিক্রির চিন্তা আগামী বছর। নিজের ঘরের পাশে ছোট একটি টিনের ঘরে দেখা মিলল গরু তিনটির। প্রতিটি গরুর জন্য দিনে ৩০০ টাকার খাবার দিতে হয়। আকারে ছোট হলেও একেকটি গরু এক লাখ টাকায় বিক্রির আশা করছেন।
আনোয়ারের ভাই মনির হোসেনও একইভাবে তিনটি গরু পালন করছেন। গরুগুলোকে ভালো খাবার দেওয়া, মশারিতে ঢেকে রাখা—এমন নানা যত্ন-আত্তির কোনো কমতি নেই আনোয়ার-মনিরের।
মীরকাদিমের নগর কসবা এলাকার সাদ্দাম হোসেন চার মাস আগে ছয়টি গরু কিনেছেন। সাদ্দাম বলেন, ‘গরুগুলো কেনার সময় হাড়গোড় বের হয়ে ছিল। এখন দেখেন কত সুন্দর। ভুসি-গম ছাড়া অন্য কিছু একেবারেই দিই না। তাই প্রতিটি গরু সাড়ে তিন লাখ টাকা দাম পাব। এলাকাতেই বিক্রি করব। হাটে যাওয়া লাগবে না।’
মীরকাদিমের গরুর সন্ধানে এখন থেকেই পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ আসছেন। ছুটির দিনগুলোতে তাঁদের আনাগোনা বেশি থাকে। অনেকে আবার কিছু টাকা দিয়ে বায়না করে যাচ্ছেন।
মীরকাদিমের গরু কী একটি ভিন্ন প্রজাতির গরু—এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রাণী উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান খান শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের লাল গরু, পাবনা ক্যাটল বা পাবনার গরুর মতোই মীরকাদিমের গরু একটি ভিন্ন জাত। প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে এসব প্রজাতি আছে।’
আজকের মীরকাদিমে হরিয়ানার গরু বা সাদা রঙের গরু বেছে বেছে পরিচর্যা করার যে রীতি চালু হয়েছে, তাকে ‘ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিচালিত’ প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেন শহীদুল হক।
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাসান আলীও বলেন, ‘এখন মীরকাদিমে যে গরু আছে, এটা মোটেও মীরকাদিমের গরুর জাত নয়। এখানে নানা জাতের গরু এনে পরিচর্যা করে ঈদের সময় বিক্রি করা হয়।’
মীরকাদিমের গরুর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বা প্রকৃত জাতের পরিচর্যা শুরু করা উচিত বলে মনে করেন হাসান আলী। এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার তিনি তাগাদাও দিয়েছেন। তবে বাস্তবে কোনো উদ্যোগ এখনো নেই বলে জানান তিনি।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার মহল্লাপ্রীতি, খাবারপ্রীতি, সম্পর্কের প্রীতি ছিল। ওখানে লোকসংখ্যা কম ছিল। সেই বৈশিষ্ট্য থেকে এখনো মীরকাদিমের গরু বিক্রি হচ্ছে। এখন গরু পালন হচ্ছে দ্রুত লাভের জন্য। মীরকাদিমের গরুও নেই, মীরকাদিমও আগের মতো নেই।’