মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে

শিল্প খাতে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে শ্রম আইনে বড় ধরনের সংশোধন আনা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিককল্যাণ তহবিলে মালিকদের মুনাফা জমা দেওয়ার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধনের এসব প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে এই ইউনিয়ন গঠন না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটিই ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে গণ্য হবে। এই ইউনিয়নই যৌথ দর-কষাকষি কার্যক্রম (সিবিএ) পরিচালনা করতে পারবে।
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রতিবছরের নয় মাসের মধ্যে আগের বছরের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিককল্যাণের জন্য ব্যয় করবেন। এই অর্থের ৮০ শতাংশ অংশগ্রহণ তহবিলে, ১০ শতাংশ কল্যাণ তহবিলে ও বাকি ১০ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়া হবে। তবে কোনো মালিক এ বিধান কার্যকর হওয়ার আগে কোম্পানির মুনাফার ১ শতাংশ অর্থ কল্যাণ তহবিলে জমা দিলে ট্রাস্টি বোর্ড কল্যাণ তহবিলে জমা করা অর্থের অর্ধেক শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে জমা দিতে বাধ্য থাকবে।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার সুবিধা বা জিএসপি বাতিল নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে শুনানি চলছে। এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে চূড়ান্ত বৈঠক হওয়ার কথা। সরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ কারণেই শ্রম আইনে দ্রুত সংশোধন আনা হয়েছে। এর আগে গত ২২ এপ্রিল এই আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে শ্রমসচিব মিকাইল শিপার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান আইনে ট্রেড ইউনিয়নের নামের তালিকা মালিকপক্ষকে সরবরাহ করতে হতো এবং এর ফলে বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছিল। এখন থেকে নামের তালিকা মালিকপক্ষকে দিতে হবে না। এ ছাড়া যেকোনো কারখানায় পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলে তাঁদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্লিনিক থাকার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। শ্রমিকের সংখ্যা কম হলে স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ট্রেড ইউনিয়ন: আইনে ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের সময়কাল দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হবে, ওই প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমশক্তি বা সদস্যের ২০ শতাংশ নারী থাকলে ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটিতে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকতে হবে।
অন্যদিকে অংশগ্রহণকারী কমিটিতে শ্রমিকপক্ষের নির্বাচিত বা মনোনীত কর্মকর্তা ও সদস্যদের কমিটির মেয়াদকালে তাঁদের সম্মতি ছাড়া মালিক বদলি করতে পারবেন না। অংশগ্রহণকারী কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধিদের কমিটির দায়িত্বসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার সময় সরল বিশ্বাসে সম্পাদিত কাজের জন্য মালিক তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারবেন না। অংশগ্রহণকারী কমিটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এ ধারার বিধান, ইউনিট অংশগ্রহণকারী কমিটির ক্ষেত্রেও যত দূর সম্ভব প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া নতুন সংশোধনীতে ‘দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন’-এর পরিবর্তে ‘পাঁচ বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন’ থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক গ্রুপ বিমা: শ্রম আইনে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক রয়েছেন, তাঁদের জন্য গ্রুপ বিমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিমা দাবির টাকা এই আইনের অধীন শ্রমিকের অন্যান্য গ্রুপের অতিরিক্ত হবে। আইনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের বিমা দাবির টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিজ উদ্যোগে আদায় করতে হবে। কোনো কারণে শ্রমিক মারা গেলে তাঁর পোষ্যদের ওই বিমার টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা আদায় করে দেবেন। ৯০ দিনের মধ্যে বিমা কোম্পানি ও মালিকের যৌথ উদ্যোগে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।
মজুরি কাঠামো: আইনে বলা হয়েছে, বিশ্বের পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সরকার শিল্প খাতের জন্য ঘোষিত নিম্নতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের যেকোনো পর্যায়ে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন এবং মজুরি হার ঘোষণা করতে পারে। এ ছাড়া সরকার চাইলে নতুনভাবে মজুরি হার ঘোষণা না করে চলমান মজুরি হারের সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে। এ ছাড়া সরকার কোনো ট্রাস্টি বোর্ড বাতিল করে এর চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্যকে অপসারণ করলে তাঁরা আর ট্রাস্টি বোর্ডে পুনর্নির্বাচিত বা মনোনীত হতে পারবেন না।
ক্ষতিপূরণ: আইন অনুযায়ী, যদি কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে দুই বছরের বেশি কাজ করেন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যান, তাহলে মালিক মৃত শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর কোনো পোষ্যকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এক বছর বা ছয় মাসের বেশি সময় কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর জন্য ৪৫ দিনের মজুরি অথবা গ্র্যাচুইটি (যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে) দিতে হবে। এই টাকা মৃত শ্রমিক চাকরি থেকে অবসর নিলে অবসরের যে সুবিধা পেতেন, তার অতিরিক্ত হিসেবে পাবেন।
অপসারণ: কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলে তাঁকে ১৫ দিনের মজুরি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ এক বছর হতে হবে। তবে অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত হলে তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। বিনা নোটিশে কোনো শ্রমিক চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে বা বিনা অনুমতিতে ১০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে প্রথমে মালিক তাঁকে যোগদানের নোটিশ দেবেন, যোগদান না করলে চাকরি থেকে অপসারণ করা হবে এবং তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না।
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের লভ্যাংশ শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টনের কথা আইনে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তবে যেসব ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে, সেসব উদ্যোগের জন্য অবশ্যই সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
ঠিকাদারি সংস্থার দায়বদ্ধতা: ঠিকাদারের পক্ষ থেকে কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে কোনো শ্রমিক নিহত বা আহত হলে তিনি শ্রম আদালতে ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ অর্থ জমা দেবেন। সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে নির্ধারিত অর্থ দেওয়ার পর ওই অর্থের কত অংশ ঠিকাদার মূল মালিককে দেবেন, তা নির্ধারণের জন্য তিনি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করতে পারবেন এবং প্রধান পরিদর্শক আবেদন পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা এ আইন অনুমোদনের বিষয়ে জানান, সংশোধনী অনুযায়ী শ্রমিকেরা যে পরিবেশে কাজ করবেন, ওই পরিবেশের জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে; যেমন বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধকতা ছাড়া বহির্গমন পথ ও সিঁড়ির ব্যবস্থা।