মেয়েদের দাবি সরকারের কাছেই

আগে ঢাকার মেয়েরা গায়ে হাত পড়া বা উত্ত্যক্ত হওয়ার ভয় নিয়ে ঘরের বাইরে বের হতেন। এখন তাঁরা ধর্ষণসহ ভয়ংকর পরিণতির শঙ্কা নিয়ে পথে বেরোন। সতর্ক থাকার উপদেশ নয়, তাঁরা চান, পুলিশ-প্রশাসন-নগররক্ষকেরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করুক।
প্রথম আলো গত দুই দিনে ঢাকাবাসী বিভিন্ন পেশার অন্তত ২০ জন তরুণ বয়সী নারীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা গণপরিবহন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সড়কবাতি চেয়েছেন। সন্ধ্যার পর অলিগলিতে পুলিশের টহল বাড়াতে বলেছেন। আর তাঁদের দাবি, পুরো শহর সিসিটিভির আওতায় আনা হোক।
গত রোববার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী কুর্মিটোলা এলাকায় ধর্ষণের শিকার হলে ক্যাম্পাসে এবং সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। র্যাব বুধবার ভোরে ধর্ষণকারী সন্দেহে এক ব্যক্তিকে ধরেছে।
এতে অবশ্য নগরে নারীর নিরাপত্তাহীনতার বোধ আর ক্ষোভ কমেনি। সম্ভাব্য ধর্ষণকারী আটক হওয়ার পর দুপুরে তাঁর ফাঁসির দাবিতে উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। ফেসবুকে যেমন, ওই জমায়েতেও আলোচনার একটি প্রধান বিষয় ছিল রাজধানীতে নারীর নিরাপত্তা।
জমায়েতের ছাত্রীদের একজনকে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কথা শুরু করেন রাগী গলায়। পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি তাঁর সহপাঠী। ঘটনার জায়গায় অনেক আগে থেকে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ হয়ে আসছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁর প্রশ্ন, তারপরও কেন ওখানে যথেষ্ট সড়কবাতি ছিল না? কেন পুলিশের নজরদারি ছিল না?
স্নাতকোত্তরপড়ুয়া এক ছাত্রী বলেন, মামার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সময় রাত আটটার দিকে আগারগাঁওয়ে প্রায় অন্ধকার রাস্তায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। ঢাকা শহরে এমন অনেক সড়ক আছে, যেখানে বাতিই নেই।
পোশাকশ্রমিকসহ কয়েকজন তরুণী এ প্রতিবেদককে বলেছেন, দিন দিন নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। যৌন হয়রানি নিত্যসঙ্গী। ঘিঞ্জি গলি থেকে ব্যস্ত সড়ক, নির্জন স্থান থেকে জনসমাগম স্থল, গণপরিবহন—সর্বত্রই এক দশা। সন্ধ্যা নামলে ভয় কয়েক গুণ বাড়ে।
>প্রথম আলো গত দুদিনে ঢাকাবাসী বিভিন্ন পেশার তরুণ বয়সী অন্তত ২০ নারীর সঙ্গে কথা বলেছে
তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তায় আলাদা গণপরিবহন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সড়কবাতি চেয়েছেন। সন্ধ্যার পর অলিগলিতে পুলিশের টহল বাড়াতে বলেছেন।
প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপ-২০১৯ বলছে, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রামের চেয়ে শহর এলাকায় উদ্বেগ বেশি। পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি শঙ্কিত। জরিপভুক্ত প্রায় ৬০ শতাংশ নারী মনে করেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অবস্থা খারাপ। গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলের তরুণদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেশি। দেশজোড়া জরিপে অংশ নিয়েছিলেন ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১ হাজার ২০০ তরুণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা বলছিলেন, পুলিশ-প্রশাসনের অবহেলা ও বিচারহীনতার কারণে ঢাকায় ধর্ষণ বাড়ছে। তাঁরা প্রশ্ন করছিলেন, এ শহরকে নারীর জন্য নিরাপদ করে গড়ে তোলার সুযোগ কি নেই? পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাঁদের দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করছেন? তাঁরা বা তাঁদের নীতি কতটুকু নারীবান্ধব?
বেসরকারি সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ ২০১৭ সালে একটি জরিপের ভিত্তিতে সুপারিশ করেছিল, নারীবান্ধব শহর গড়ার জন্য নগর-পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি পর্যায়ে নারীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
নগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)। উপকমিশনার (জনসংযোগ ও গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নারী কোনো অপরাধের শিকার হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। পুলিশ রাস্তায় নিয়মিত টহল দেয়, জনগণকে সচেতন করে, চেকপোস্ট আছে। নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগ এবং জাতীয় জরুরি হেল্পডেস্ক ৯৯৯ তো আছেই।
ডিএমপি অধ্যাদেশে উত্ত্যক্তের প্রসঙ্গে নারীর নিরাপত্তার জন্য আলাদা বিধান আছে। তাদের ওয়েবসাইটে রাতের বেলা আলোকিত পথে চলা, নির্জন জায়গা এড়িয়ে ব্যস্ত রাস্তায় চলাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা আছে। কিন্তু সেটা সব নাগরিকের প্রতি।
বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সম্প্রতি গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে এক বার্তায় বলেছে, বাসে পাঁচ-সাতজনের কম যাত্রী থাকলে নারী যেন সতর্ক থাকে। বাসে যেন সে না ঘুমায় কিংবা দ্রুত নামার মতো সিট বেছে বসে। দরকার হলে ৯৯৯-এ ফোন করে। করণীয় সবই নারীর, পুলিশের করণীয় সম্পর্কে বলা নেই।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ২০১৮ সালে ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের ৪১৫ জন নারীর ওপর একটি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। জরিপটি বলছে, গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ৮১ শতাংশ প্রতিবাদ করেন না, প্রতিকার খোঁজেন না।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে বেশির ভাগ নারী নিজেদের জন্য আলাদা বাস চেয়েছেন। এখন সরকারি খাতের বিআরটিসি ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের জন্য ১৯টি বাস চালায়। সেগুলোর ১৮টিই দিনে মাত্র দুবার শুধু মতিঝিলের পথে যাতায়াত করে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে চারটি বাস চলে।
তবে ব্র্যাকের জেন্ডারবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান সেলিনা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আলাদা বাস স্থায়ী সমাধান নয়। নীতিমালা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই, বিচারে গতি চাই। পাশাপাশি নারীকে দেখার চোখ বদলানো খুব জরুরি।’