যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক জোটে যোগ দিতে সময় নিতে চায় বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত ২৩ মে টোকিও সফরের সময় প্রাথমিকভাবে ১২টি দেশকে যুক্ত করে আইপিইএফের আনুষ্ঠানিক যাত্রার কথা ঘোষণা করেন
ছবি: রয়টার্স

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক জোট আইপিইএফে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক মাস ধরেই নানা স্তরে আলোচনা করছে। নতুন এই জোটের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এবং র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে আইপিইএফে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সময় নেওয়াটা সমীচীন মনে করছে বাংলাদেশ।

সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক কাঠামোতে (আইপিইএফ) বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়ে এই মনোভাব পাওয়া গেছে।

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রায় তিন মাস আগেই বাংলাদেশকে এর মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বাংলাদেশের কাছে ফেব্রুয়ারি মাসেই আইপিইএফের একটি অনানুষ্ঠানিক খসড়া হস্তান্তর করেছিলেন।

অবশ্য ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে বলেছেন, মার্চ মাস থেকে আইপিইএফের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টোকিও সফরের সময় গত ২৩ মে প্রাথমিকভাবে ১২টি দেশকে যুক্ত করে আইপিইএফের আনুষ্ঠানিক যাত্রার কথা ঘোষণা করেছেন। হোয়াইট হাউস থেকে প্রচারিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রাথমিকভাবে অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম—এই ১২ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইপিইএফে যুক্ত হয়েছে।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অংশীজনদের নিয়ে আলোচনায় বসে এটা যাচাই করে দেখব। এখানে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার কিছু নেই। এটা তো এমন নয় যে কেউ আমন্ত্রণপত্র নিয়ে আমাদের কাছে এসেছে। ওরা এটা ঘোষণা করেছে। নিজেদের (যুক্তরাষ্ট্র) অবস্থানের জানান দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই আমাদেরও বিষয়টি বুঝতে হবে।’

সময় নেওয়াটা সমীচীন

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা গত কয়েক বছরে অনেক দৃশ্যমান। করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় টিকা কূটনীতি নিয়ে বড় দুই শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে বিষয়টি এখন আর কারও অজানা নয়। তবে চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বিআরআই) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (আইপিএস) ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি করেছে, আইপিইএফ তাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে ঢাকা ও বেইজিংয়ে বসে চীনের কূটনীতিকেরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, বাংলাদেশকে সতর্ক করছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে সাম্প্রতিক মার্কিন উদ্যোগে আবারও তাঁরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে এই দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আইপিইএফের বিষয়ে কালক্ষেপণের নীতিতে হাঁটছে। কারণ, কয়েক বছর ধরেই পদ্মা সেতুর পাশাপাশি বাংলাদেশের অনেক বড় কাঠামোতে সহযোগিতা, অর্থায়নসহ নানাভাবে চীন জড়িয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা খাতেও দেশটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিন ধরে।

আবার যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি বহুমাত্রিক হওয়ার পর বিনিয়োগ শুধু জ্বালানিতে সীমিত। তা ছাড়া র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞায় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে বোঝাপড়ায় ঘাটতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মনে করছে, আইপিইএফের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সময় নেওয়াটা সমীচীন।

জোট ঘোষণার তিন মাস আগেই খসড়া

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক সুমনা গুহের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই আলোচনায় হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও বাণিজ্য দপ্তরের কর্মকর্তারা যুক্ত হয়েছিলেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিস্তারিতভাবে আইপিইএফের বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে উপস্থাপন করে। এরপর বাংলাদেশের কাছে নতুন মার্কিন জোটের মূল উপাদান-সংবলিত ৬ পৃষ্ঠার একটি অনানুষ্ঠানিক খসড়া তুলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

জানা গেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তখন অনানুষ্ঠানিক খসড়াটি ঢাকায় পাঠানো হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ পরিচালককে জানিয়েছিলেন। পরে ঢাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়াশিংটনের বৈঠকের পরপর ওই খসড়া ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক খসড়ায় যা আছে

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নতুন অর্থনৈতিক জোট আইপিইএফে চারটি প্রধান উপাদান রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের কাছে যে অনানুষ্ঠানিক খসড়া যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, তাতে এই চার উপাদান বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ন্যায্য ও সহনশীল অর্থনীতি নামের প্রথম উপাদানে কীভাবে এই শর্ত পূরণ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এখানে ডিজিটাল অর্থনীতি, বিকাশমান প্রযুক্তি, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, অবাধ, সুষ্ঠু ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিতের স্বার্থে স্বচ্ছতা এবং প্রক্রিয়ায় উন্নত চর্চার বিকাশ, খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক টেকসই নীতিমালা এবং জোটে যুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিতের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে উত্তরণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে তহবিল জোগানের বিষয়টি প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুষ্ঠু করব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াগুলোর বাস্তবায়ন, ঘুষবিরোধী জোরালো অভিযান, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও সৃজনশীল প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সরকারি কেনাকাটা ও জমি হস্তান্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও দিল্লি ইউনিভার্সিটির বঙ্গবন্ধু ফেলো মো. শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশকে আইপিইএফে দেখতে চাওয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথাটি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যখন বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে একটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, বুঝতে হবে এটি তাঁদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মহলের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তাই এ নিয়ে দেশের স্বার্থে এবং বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা জরুরি।