রবীন্দ্র-নজরুল: সম্পর্কের টুকরো গল্প

রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ উত্তরা শাখা আয়োজিত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক বিষয়ে পাঠচক্রে ছিলেন রফিকুল ইসলাম ও সন্জীদা খাতুন l ছবি: সাহাদাত পারভেজ
রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ উত্তরা শাখা আয়োজিত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক বিষয়ে পাঠচক্রে ছিলেন রফিকুল ইসলাম ও সন্জীদা খাতুন l ছবি: সাহাদাত পারভেজ

দোলনচাঁপা দিয়ে বরণ করা হলো দুজনকে। রফিকুল ইসলাম ও সন্জীদা খাতুন একটু পর বলবেন, কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের সম্পর্ক। উত্তরার সাউথ ব্রিজ স্কুলে চেয়ার-টেবিল পেতে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ উত্তরা শাখার আয়োজন এই পাঠচক্র।
কথা ছিল রফিকুল ইসলাম ও সন্জীদা খাতুনের রচনা থেকে পাঠ করা হবে প্রথমে। সে অনুযায়ী সন্জীদা খাতুনের প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল: পরস্পর সম্পর্ক’ পাঠও হলো। উপস্থাপিকা মাইকটি এবার এগিয়ে দিলেন সন্জীদা খাতুনকে। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ উত্তরা শাখার সভাপতি ফাহ্মিদা খাতুন বললেন, দুজনের লেখাটা পড়া শেষ হোক না! কিন্তু সন্জীদা খাতুন বললেন, ‘রফিকুল ইসলামের লেখা পড়ার পর আমার কথা আর কেউ শুনতে চাইবেন না।’
প্রবন্ধ থেকে জানা গেল রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের টুকরো টুকরো গল্প। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকার জন্য আশীর্বচন লিখে দিয়েছিলেন। পরে নজরুলের নবযুগ, লাঙল পত্রিকার জন্যও নজরুল লিখেছিলেন। তাঁরা দুজনেই ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদ করেছিলেন। নজরুল তাঁর ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ কবিতায় লিখেছেন, ‘“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?’ আর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব;/ ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ’।
নজরুলের রক্ত অর্থে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করেছেন—এ কথা রটিয়ে দেওয়া হলো। সন্জীদা খাতুন বললেন, শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাস ও মোহিতলাল মজুমদারেরা তখন নজরুলকে কবি বলতেই চাইতেন না। সে সময়টায় রবীন্দ্রনাথকেও নজরুল সম্পর্কে ভুল বোঝানোর চেষ্টা ছিল। তাই এমন একটি কথা শুনে নজরুল খুব ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি লিখলেন, ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’। যে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কবিতায় আরবি-ফারসি ব্যবহারের প্রশংসা করেছিলেন, তিনি কী করে অমন কথা বলতে পারেন?
কিন্তু পরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তিনি নজরুলকে সে কথা বলেননি। তাঁর মন্তব্য ছিল কোনো উদীয়মান কবির জন্য, কোনো উদিত কবির জন্য নয়। রবীন্দ্রনাথও ব্যথিত হয়েছিলেন, নজরুল কেন রটনাটি বিশ্বাস করলেন। ১৯২০-১৯৪১ পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কে এই একটি ‘খুনের মামলা’ অভিমান পর্ব ছাড়া আর কোনো ছেদ চোখে পড়ে না।
রফিকুল ইসলামের ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ প্রবন্ধ থেকে জানা গেল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নজরুলকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেবার নজরুল অবলীলায় গেয়েছিলেন একের পর এক রবীন্দ্রসংগীত, সবগুলোই তাঁর কণ্ঠস্থ। রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, তাঁর নিজেরই এখন আর গানের কথা মনে থাকে না।
নজরুল তখন জেলে। রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নাটকটি উৎসর্গ করলেন নজরুলকে। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এটি পছন্দ করলেন না। রবীন্দ্রনাথকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন তাঁরা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বললেন, জাতির জীবনে বসন্ত এনেছেন নজরুল, তাই এ নাটকটি তাঁকেই উৎসর্গ করা হবে। জেলে যখন নজরুল রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে নাটকটি হাতে হাতে পেয়েছিলেন, তাঁর জেলজীবনের যন্ত্রণা কমেছিল। পরে নজরুল সে কথা লিখেছিলেনও।
হুগলি জেলে নজরুলকে নিয়ে আসা হলো। জেলার খুব অত্যাচারী ছিলেন। নিত্যনতুন উপায়ে তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন। তখন নজরুল ও অন্য বন্দীরা তাঁর উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে’র প্যারোডি করে গাইলেন, ‘তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে/ তুমি ধন্য ধন্য হে’। এরপর নজরুল অনশনে চলে যান। কলকাতার পত্রিকায় খবর বের হয়, ১৪ দিন ধরে তিনি অনশনে আছেন। এ খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম করেন নজরুলকে, ‘অনশন ছেড়ে দাও। আমাদের সাহিত্যে তোমাকে দরকার।’ কিন্তু সে টেলিগ্রাম ইংরেজরা পৌঁছে দেয় না নজরুলকে।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ব্যথিত নজরুল লিখলেন ‘রবিহারা’ কবিতাটি, ‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত-পথের কোলে’। গানে লিখলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’। রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রার ধারাবিবরণী নজরুল স্বকণ্ঠে দিয়েছিলেন আকাশবাণী কলকাতা থেকে।
১৯৪১ সালের আগস্টে কবিগুরুর মৃত্যুর মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৪২-এর জুলাইয়ে নজরুলও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি ক্রমশ সংগীতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। কাছাকাছি সময়েই বাংলা সাহিত্য এ দুজন কবিকে হারায়।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন প্রশ্ন করেন, রবীন্দ্রনাথ আসলে নজরুলকে কী চোখে দেখেছিলেন? তাঁদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো কি আসলেই ছিল, নাকি আমরাই বাড়িয়ে তুলেছি?
উত্তরে সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘এটা করেছি আমরাই। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুলই বড়—এ ধরনের কুতর্ক আমরাই করেছি। বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, নজরুল বাংলা সাহিত্যে নতুন রক্ত নিয়ে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথও এভাবেই দেখতেন নজরুলকে।’
বাংলা সাহিত্যের দুই প্রবাদপুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক রটনা, ভুল-বোঝাবুঝি আছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বিষয়ে কৃতবিদ্য যে দুজন, সন্জীদা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম, তাঁরাই পরিষ্কার করলেন, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের মতোই।
এ ধরনের অনুষ্ঠান এখন খুব একটা হয় না। হলে অনেক কূটতর্কের অবসান হতো অনায়াসে।