রেদওয়ানের তিন তলা থেকে পড়ে যাওয়ার দায় কে নেবে?

স্কুলের তিন তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর বাড়িতে চিকিৎসা চলছে রেদওয়ানের
ছবি: সংগৃহীত

জাহিদা ফাতেমার আদরের সন্তান নাফিস উদ্দিন রেদওয়ান। অটিস্টিক ছেলেকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আক্ষেপ করেই যাচ্ছেন জাহিদা ফাতেমা। তিনি লিখেছেন, আমার আদরের বুকের মানিক — আজ কী অবস্থা। রাজধানী উত্তরার একটি বিশেষ স্কুলের তিন তলার বারান্দা থেকে পড়ে বিদ্যুতের তারের ওপর ঝুলে ছিল নাফিস। সেখান থেকে নিচে পড়ে গেলে রাস্তার মানুষের চিৎকারে স্কুলের শিক্ষকেরা ছুটে আসেন।

জাহিদা ফাতেমা ফেসবুকে লিখেছেন ছেলের মুখ থেঁতলে গেছে। কয়েকটি দাঁত গোড়া থেকে পড়ে গেছে। আলগা হয়ে গেছে মাড়ি। পা ভেঙে যাওয়ায় তিন মাস বাম পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবে না ছেলে। চিকিৎসকেরা পায়ে রড লাগিয়ে রেখেছেন।

উত্তরার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিচালিত স্কুল অপ্সরা মনবিকাশ কেন্দ্র। স্কুলটির তিন তলা থেকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পড়ে গিয়েছিল রেদওয়ান। রাজধানীর দুটো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে বাসায় চিকিৎসাধীন। ছেলে বাসায় ফেরার পর বুধবার উত্তরা পশ্চিম থানায় স্কুলটির প্রিন্সিপাল শারমিন মুজাহিদকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছেন রেদওয়ানের বাবা হাবিব আব্দুর রহমান।

জাহিদা ফাতেমার আক্ষেপ থামছেই না। প্রথম আলোকে বললেন, স্কুল থেকে ফোন পেয়ে যখন ছেলেকে দেখতে যান তখন পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ছেলের। করোনার প্রায় পুরো সময় ছেলেকে বাসায় আগলে রেখেছিলেন। করোনার প্রকোপ একটু কমলে দেড় মাস আগে ছেলেকে ওই স্কুলে ভর্তি করান।

স্কুলটিতে রেদওয়ানের ভর্তি ফি ১০ হাজার টাকা এবং মাসিক ফি ১০ হাজার টাকা। জাহিদা ফাতেমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘ছেলের পায়ে অপারেশন চলছে, তখনো স্কুলের প্রিন্সিপাল বলছিলেন তাঁর স্কুলের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। ছেলে বাঁচবে না মরবে আমরা সে চিন্তা করছিলাম, আর তিনি তাঁর স্কুলের চিন্তা করছিলেন।’

ছেলেটির পায়ে অস্ত্রোপচারসহ চিকিৎসার পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে পরিবারের
ছবি: সংগৃহীত

ঘটনার পর স্কুলের এক শিক্ষক বলেছেন, রেদওয়ানের তো বোধ কম। তিন তলা থেকে পড়ার পর হাসপাতালে নেওয়া পর্যন্ত গান গাচ্ছিল। এ প্রসঙ্গে জাহিদা ফাতেমা বলেন, ছেলেটা এত উঁচু জায়গা থেকে পড়ায় ট্রমার মধ্যে ছিল, অথচ শিক্ষক বলেছেন ওর বোধ কম।

গত সোমবার স্কুলটির প্রিন্সিপাল শারমিন মুজাহিদ জাহিদা ফাতেমাকে ‘ভাবি’ সম্বোধন করে ছয় পৃষ্ঠার হাতে লেখা একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে দুর্ঘটনার জন্য রেদওয়ানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তাতে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন। দুর্ঘটনার পর রেদওয়ানকে হাসপাতালে নেওয়াসহ বিভিন্নভাবে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করেছেন তা–ও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। গত আড়াই বছর ধরে স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। এমন কথা বলে এই মুহূর্তে আর সহায়তা করতে না পারলেও ভবিষ্যতে রেদওয়ানের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন স্কুলের প্রিন্সিপাল।

শারমিন মুজাহিদ চিঠিতে আরও লিখেছেন বারান্দায় গ্রিল না থাকাটা ঠিক হয়নি। রেদওয়ানের শিক্ষকের অসচেতনতায় এ ঘটনা ঘটেছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে ইচ্ছে করে কেউ রেদওয়ানের ক্ষতি করেনি বলে দাবি করা হয়েছে চিঠিতে। লেখা হয়েছে, এ ঘটনায় শারমিন মুজাহিদেরও ক্ষতি হয়েছে, যদিও তা রেদওয়ানের ক্ষতির তুলনায় কিছুই না। ঘটনার পর তিনি নিজে রেদওয়ানকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এমনকি রেদওয়ানের পরিবার এরপর যে হাসপাতালে নিতে বলেছে সেখানেই নিয়ে গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

উত্তরার এই স্কুলটি থেকে পড়ে যায় রেদওয়ান
ছবি: সংগৃহীত

শারমিন মুজাহিদ চিঠিতে লিখেছেন, যে কক্ষটির পাশের বারান্দা থেকে রেদওয়ান নিচে পড়ে গেছে সেটি প্রিন্সিপালের অফিস কক্ষ। প্রয়োজন ছাড়া কক্ষটিতে তেমন কেউ যায় না। এছাড়া কক্ষটির দরজা লাগানো থাকে। ঘটনার দিন কোনোভাবে দরজা খোলা ছিল। ওই সময় তিনি দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলেন, এর ফাঁকেই রেদওয়ানের ঘটনাটি ঘটে।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে শারমিন মুজাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর দুটো মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে। তাঁর মেসেঞ্জারে খুদে বার্তা দিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর স্বামীর মুঠোফোনে কল দিয়ে শারমিন মুজাহিদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে একটু পর ফোন দিচ্ছেন বলে তাঁর স্বামী ফোন রেখে দেন। পরে আর ফোন করেননি।

স্কুলটির প্রশাসনিক দিকটি দেখছেন ফারজানা শারমিন। বর্তমানে তিনি পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে ঢাকার বাইরে আছেন। বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে বললেন, ‘রেদওয়ান বেশ অস্থির বাচ্চা। ঘটনার দিন রেদওয়ানকে দেখাশোনা করেন যে শিক্ষক তিনি রেদওয়ানের বাড়ির কাজগুলো আমাকে দেখানোর জন্য আমার রুমে এসেছিলেন। রেদওয়ানের বেশ প্রশংসাও করছিলেন ওই শিক্ষক। নিচে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বাইরে গিয়ে দেখি রেদওয়ান পড়ে গেছে। ওই শিক্ষক একটু সময়ের জন্য রেদওয়ানকে চোখের আড়াল করেছিলেন, আর এ সময়েই...।’ ঘটনার পর ওই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শারমিন মুজাহিদ।

রেদওয়ানের বাবা হাবিব আব্দুর রহমান বলেছেন, ছেলের মুখের প্লাস্টিক সার্জারি, পায়ে অস্ত্রোপচারসহ চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে পাঁচ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সামনে চিকিৎসায় আরও খরচ আছে। সব মিলিয়ে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। রেদওয়ানের বাবা মায়ের প্রশ্ন একটাই—রেদওয়ানের আজকের যে পরিণতি তার দায় কে নেবে?

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারায় (শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার দণ্ড) হেফাজতে থাকা শিশুর প্রতি অবহেলা জনিত অপরাধে মামলা হয়েছে। সেটির তদন্ত চলছে।