লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, শাস্তি নামমাত্র

চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় এমবি নাসরিন-১ লঞ্চডুবিতে নিহত হন ১১০ জন। নিখোঁজ হন ১৯৯। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঘূর্ণাবর্তে পড়ে ডুবে যায় লঞ্চটি। ওই নৌ দুর্ঘটনায় লঞ্চটির মালিক এবং মাস্টারও নিহত হন।
এ ঘটনায় করা মামলায় লঞ্চটির নকশা তদারকি দলের (সুপারভাইজার প্যানেল) দুই সদস্যের এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে এক বছর করে কারাদণ্ড হয়। অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স) অনুযায়ী গঠিত নৌ আদালতে এ রায় হয়। সে সময় আইনে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও ২০০৫ সালে আনা সংশোধনীতে তা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করা হয়। ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকার পরিবর্তে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা করা হয়। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
নৌ দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি হলেও শাস্তির এমন বিধান নামমাত্র বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অধ্যাদেশের কয়েকটি ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন।
তবে অধ্যাদেশটি আবারও সংশোধনের বিষয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে পাঠানো প্রস্তাব নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রায় দুই বছর পড়ে আছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি সভাও হয়েছে।
জানতে চাইলে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলাম গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, আইনের কয়েকটি ধারায় ২০০৫ সালে সংশোধন আনা হয়। এরপর সংশোধন বিষয়ে প্রস্তাব নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, নৌযান দুর্ঘটনায় ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৯২টি তদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে নৌ আদালতে ৩০৮টি মামলায় ২৬৫টিতে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া পরিদর্শন-কালে ত্রুটিজনিত কারণে গেল বছর ৫৭৫টি মামলা হয়। এর ৩৭৫টি নিষ্পত্তি হয়। চলতি বছরে এর সংখ্যা ২৬০। নিষ্পত্তি হয়েছে ২০৬টি। নৌ আদালতে এই দুই ধরনের মামলা আসে।
২০০২ সালের এপ্রিলে ঢাকা-ভোলা নৌপথে এমভি সালাউদ্দিন-২ লঞ্চ মেঘনা নদীর ষাটনল এলাকায় ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। এতে সাড়ে তিন শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। এ ঘটনায় অধ্যাদেশ অনুযায়ী দণ্ডও হয়। বিভিন্ন ধারায় লঞ্চমালিকের পরিবারের পাঁচ সদস্যের এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে সর্বশেষ এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানায় ফৌজদারি আইনে মামলা হয়েছে। পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্য হয়রানি এড়াতে এসব ক্ষেত্রে সাধারণত নৌ আদালতে মামলা হয়ে থাকে। এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পুলিশ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনেও মামলা করতে পারে।
পিনাক-৬ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লৌহজং থানায় কেন মামলা করা হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘লঞ্চ পরিচালনায় সংশ্লিষ্টরা লঞ্চের ধারণক্ষমতা জানার পরও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করেছে। যার জন্য এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা ফৌজদারি বিষয়। তাই আমরা স্থানীয় থানায় মামলা করেছি।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, মামলা করার আগে তাৎক্ষণিক ভাবা হয়নি, পিনাকের মামলাও কখনো নৌ আদালতে যেতে পারে।
কয়েকটি ধারা:
অভ্যন্তরীণ নৌ অধ্যাদেশের ৫৫ ধারা বলছে, ঝড়ের সংকেত থাকাবস্থায় নৌযাত্রা নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধারার শর্ত ভঙ্গ হলে অভ্যন্তরীণ নৌযান মাস্টারের তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অধ্যাদেশের ৭০ ধারায় অসদাচরণ ইত্যাদির কারণে জাহাজ বিপদাপন্ন করার শাস্তি বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। ধারাটির (২) অনুসারে যেখানে কোনো অভ্যন্তরীণ নৌযান দুর্ঘটনার ফলে প্রাণহানি বা কোনো ব্যক্তি আহত বা নৌযানের বা অন্য কোনো নৌযানের সম্পদ নষ্ট হয়ে থাকে এবং এ ধরনের কোনো নৌযানের ত্রুটি বা অভ্যন্তরীণ নৌযানের মালিক, মাস্টার বা কোনো কর্মকর্তা বা ক্রু সদস্যের অযোগ্যতা বা অসদাচরণ বা কোনো আইন ভঙ্গের দরুন ঘটে থাকে, তবে ওই নৌযানের মালিক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা বা ক্রু সদস্য বা তাঁদের প্রত্যেকেই পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হতে পারেন।
তবে নৌযানের ক্ষেত্রে নকশা, কাঠামো ও পরিচালনায় অনিয়ম এবং অবহেলা থাকার পর তা ডুবলে তাকে দুর্ঘটনা বলতে চান না বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক খবিরুল হক চৌধুরী। তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে আইন ও বিধি যথাযথ অনুসরণ এবং সতর্কতা সত্ত্বেও যদি ঘটনা ঘটে, তবে তা দুর্ঘটনা হতে পারে। তিনি বলেন, এমবি নাসরিন-১-এর নির্মাণে ত্রুটি ছিল। একে নৌ দুর্ঘটনা বলা যায় না। আইনে নৌ দুর্ঘটনা হিসেবে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অপর্যাপ্ত। অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর সংশোধন প্রয়োজন।
যাত্রীবাহী নৌযানের ওপরের ডেকে মালামাল বহন না করার বিষয়ে ৫৮ ধারায় বলা হয়েছে। ধারাটি ভঙ্গ করলে নৌযানটির মালিক তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং মাস্টার তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
অতিরিক্ত যাত্রী বহনে শাস্তির বিধান রয়েছে ৬৭ ধারায়। এ ধারা অনুসারে কোনো অভ্যন্তরীণ নৌযান বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোনো নৌযাত্রায় নির্ধারিত সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলে মালিক বা তাঁর প্রতিনিধি বা মাস্টারকে (যাঁরা যাত্রার সময় মালামাল ওঠানো-নামানোর সময় উপস্থিত থাকবেন) প্রত্যেক যাত্রীর জন্য ৩০০ টাকা, তবে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে।
অধ্যাদেশের শাস্তিসংক্রান্ত কয়েকটি ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রসিকিউটিং কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাদেশে নৌযান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অপর্যাপ্ত। এ ছাড়া পরিদর্শনব্যবস্থা জোরদার করার জন্য পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, ফৌজদারি মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। ক্ষতিপূরণের মামলায় এর দরকার পড়ে না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে ১৮৮৫ সালের ফ্যাটাল অ্যাক্সিডেন্ট অ্যাক্টের আওতায় আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন।
রাজধানীর মতিঝিল সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কার্যালয় ভবনে ওই আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একজন যুগ্ম জেলা জজ বিচারকাজ পরিচালনা করছেন।