
১৪২ বছর আগে ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে একটি টাউন হল নির্মিত হয়। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে ফরাশগঞ্জের এ টাউন হলটিকে নর্থব্রুকের নামে নামকরণ করা হয়। তবে দালানটি লাল রঙের হওয়ায় এটি লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিত।
১৯২৬ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসবেন। বড় মাপের কবি, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী নবাবদের তুরাগ বোট হাউস? কবি তুরাগ বোটকেই বেছে নেন। নদী-তীরবর্তী লালকুঠিতে তাঁকে ৭ ফেব্রুয়ারি নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২০ শতকের ষাটের দশক। প্রতি সপ্তাহেই নাটক চলছে। আর মহড়ার ভিড় তো লেগেই থাকে। পাড়াটিও সব সময় জমজমাট। নাটক দেখায় মানুষের ব্যাপক উৎসাহ।
দুটি ঘটনাই তৎকালীন ঢাকা শহরের বিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ফরাশগঞ্জের লালকুঠিকে ঘিরে। রবীন্দ্রগবেষক আহমেদ রফিক তাঁর বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ বইতে ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের এই নাগরিক সংবর্ধনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, শহুরে মানুষে কুঠির হলঘর পরিপূর্ণ ছিল। বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তখন বিনোদনের তেমন কোনো জায়গা ছিল না। মানুষ এখানে আসত, প্রচণ্ড ভিড় হতো।’ লালকুঠির মূল ভবনের ডান দিকে বড় একটি মঞ্চে নাটক হতো। তিনি আরও বলেন, এই লালকুঠি থেকেই তাঁর সিনেমায় আসা।
আতিকুর রহমান খান, প্রবীর মিত্রের সমসাময়িক লালকুঠির আরেক নাট্যশিল্পী। তাঁর দলের নাম ছিল ‘খেয়ালি’। কাজের কথা বলতে গিয়ে বর্তমানে পেশায় ব্যবসায়ী এই অভিনেতা বলেন, ‘কঙ্কাবতীর ঘাট নাটকে আমি ছিলাম নায়ক। বেশ কয়েক দিন রিহার্সাল করেছিলাম কুঠিতে। ২০-২৫ জন মানুষ আসত শুধু রিহার্সাল দেখতেই।’
এই দুই অভিনয়শিল্পীর কথাতেই উঠে আসে তখনকার সময়ে নাটকে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি। শখের বশে নয়, সংখ্যায় কম হলেও তখন পেশাদার নারী অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন। সে সময় লালকুঠি ছিল এখনকার বেইলি রোড।
এখন কী হয় লালকুঠিতে
নর্থব্রুক হল সড়ক ধরে সোজা চলে গেলেই লালকুঠি ঘাট। হাতের বাঁ দিকে ফরাশগঞ্জ ক্লাব। ক্লাবের গেট দিয়ে ঢুকেই চোখে পড়ল বিশালাকার কিছু ডেকচি পড়ে আছে খোলা একটি জায়গায়। লাকড়ির চুলোয় ধোঁয়া উড়ছে। ভেসে আসছে লঞ্চের সাইরেন। চারদিকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে লাল রঙের একটি দালান দেখা গেল। দালানের ডান দিকে ওয়ার্ড কমিশনারের অফিস ও কমিউনিটি সেন্টার। বাঁ দিকে ফরাশগঞ্জ ক্লাব। আর পেছনটায় আছে শতবর্ষী একটি পাঠাগার, যা জনসন হল নামে পরিচিত।
লালকুঠির সেই জৌলুশ আর নেই। লাল রংও মলিন হয়ে গেছে। জানালার কোটরে পাখির বাসা। কিছু কিছু জায়গা ভাঙা। দালানটিতে ঢুকে চোখে পড়ল সিটি করপোরেশনের নতুন কিছু ডাস্টবিন। বড় একটি অডিটরিয়াম আছে, তবে কাঠের মঞ্চটি নড়বড়ে। কিছু জায়গা ভেঙেও পড়েছে। পেছন দিকে সাজসজ্জার ঘর। তারও করুণ দশা।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে এ লালকুঠির দায়িত্বে থাকা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, এখানে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় দেড়-দুই বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ। তিনি আরও বলেন, এটির সংস্কারের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার আবেদন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেই।
লালকুঠি নিয়ে কথা হয় প্রত্নতত্ত্ব স্থাপনা সংরক্ষণবাদী সংগঠন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী স্থপতি তৈমুর ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, মোগল ও ইংরেজ স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন এই লালকুঠি। স্থানীয় মানুষের নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে লালকুঠি গড়ে উঠেছে, যা এখন কমই দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, মূল দালানটি সংস্কার করে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।
লালকুঠি তার জৌলুশ ফিরে পেলে পুরান ঢাকার একটি সংস্কৃতিকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।