শত বছর পরও টিকে থাকবে এই পদ্মা সেতু

ছবি: দীপু মালাকার

রোদঝলমলে ফুটফুটে সকাল। এক টানে মাত্র ২০ মিনিটে চলে গেলাম ওয়ারী থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মঞ্চে। আজ শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নের এই সেতু উদ্বোধন করলেন। তিনি বললেন, ‘এ সেতু আমাদের শুধু স্বপ্ন নয়, আমাদের অহংকার। আমাদের গর্ব।’

শুরু থেকেই কত কথাই না হয়েছে। বাংলাদেশ পারবে এত বড় সেতু নির্মাণ করতে! জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমরা কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি।’ তিনি আরও বললেন, ‘বিশ্বে একমাত্র আমাজন নদীর পরই প্রবল ঢেউয়ের নদী আমাদের এই পদ্মা। তাই চ্যালেঞ্জ ছিল বেশ কঠিন। নদীশাসনের বিরাট কাজটা আমরা সুষ্ঠুভাবে করেছি। এ ছাড়া পদ্মা নদীর তলদেশ অনেক স্থানেই খুব নরম। পাইলিংয়ের সমস্যা ছিল। এ রকম নদীর ওপর ভূমিকম্প সহনীয় সেতু নির্মাণ সত্যিই বিরাট চ্যালেঞ্জ। আজ আমরা বিশ্ববাসীর কাছে মাথা উঁচু করে বলছি, কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সক্ষম।’

যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানসহ আরও অনেক দেশ আমাদের এ সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছে। এর চেয়ে বড় আর কম হতে পারে।

সেতুতে মানুষের ঢল। ২৫ জুন
ছবি: দীপু মালাকার

আজ আমরা বলতে পারি, পদ্মা সেতু অন্তত ১০০ বছর টিকবে। এরপরও হয়তো এই সেতু টিকে থাকবে। কারণ, সেতু নির্মাণে সব ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ তথ্য আজ তো জানলামই, এর আগেও জানিয়েছিলেন সেতু নির্মাণে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্যানেলের অন্যতম সদস্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্রায় বছর তিনেক আগে বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এটা জানান।

এ ধরনের সেতু নির্মাণের সময় যে ধরনের কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকে, তার মধ্যে দুটি বিষয় আমরা এখানে ব্যাখ্যা করব। প্রথমত, এর স্থায়িত্বকাল। যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের সময় যেসব বিষয় হিসাবে রাখা হয়, তার মধ্যে এর স্থায়িত্বকাল অন্যতম প্রধান। যদি বেশি সময় টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে এর নির্মাণ স্ট্র্যাটেজি হতে হবে বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সে জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এর একটি হলো ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা। কারণ, ১০০ বছর তো যে-সে কথা নয়। এত বছরে ভূমিকম্প বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তো থাকতেই পারে। বিশেষত, সেতু এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এ ধরনের অঞ্চলে প্রতি ১০০ বছরে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আসামসহ এ অঞ্চলে ১৮৯৭ সালে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল, তারপর অন্তত ১২৫ বছর পার হয়ে গেছে। সুতরাং ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রবল—এটা ধরে নিয়েই পদ্মা সেতু তৈরি করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুকে ভূমিকম্প সহনীয় করতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় মাটির যে কম্পন সৃষ্টি হয়, তার ফলে যেন সেতুর উপরিকাঠামোর ক্ষতি না হয়, সে জন্য ব্যবহার করা হয় ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং। এটি ব্যবহার করলে ভূমিকম্পের সময় সেতুর পাইলিং আনুভূমিকভাবে নড়াচড়া করবে, ফলে মূল সেতুর কাঠামোয় এর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফ্রিকশন বিয়ারিং পেন্ডুলাম পাইলিং তৈরি করা হয়। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়, সব ঠিকমতো কাজ করছে কম না। ডিজাইন অনুসারে, এটি প্রায় ১০ হাজার টন লোড সামলাতে সক্ষম।

মাওয়ায় পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর রঙিন ধোঁয়া ওড়ানো হয়
ছবি: পিআইডি

সেতু নির্মাণে আরও একটি বিষয় হিসাবে রাখা হয়েছে। অন্তত ১০০ বছরের জন্য সেতুটি নির্মাণ করতে হলে এর নিচ দিয়ে কম পরিমাণ পানি প্রবাহিত হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা নদীর ক্ষেত্রে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ বজায় রাখা প্রয়োজন, যা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানিকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে দেবে। আমাজন নদীর পর এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবাহ।

ওই হিসাব থেকেই সেতুর নিচের পিলারগুলোর অবস্থান ঠিক করতে হয়েছে, যেখানে এটি প্রায় ১৫০ মিটার দূরত্বে। এর চেয়ে কম হলে পিলার বেশি লাগত, পাইলের সংখ্যা বেড়ে যেত।

এ ছাড়া সেতুর নিচ দিয়ে যেন জাহাজ চলাচল করতে পারে, সে জন্য পর্যাপ্ত ক্লিয়ারেন্স রাখতে হয়েছে। এ কারণে সেতুর নিচের এ উচ্চতা নিশ্চিত করতে এর কাঠামোর তলদেশ উঁচু করতে হয় এবং এর জন্য যে অ্যাপ্রোচ স্লোপ করা হয়, সে উচ্চতার কথাও মাথায় রাখতে হয়।

পদ্মা সেতু
ফাইল ছবি

একই সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনও চলাচল করবে। এটাও কিন্তু এক বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের পদ্মা সেতুতে ওপরে ও নিচে—দুটি সমান্তরাল পথ থাকবে। নিচের অংশে চলবে ট্রেন ও ওপরের অংশে মোটরচালিত গাড়ি। সাশ্রয়ী মূল্যে কিন্তু প্রয়োজনীয় চাপসহনীয় এ দোতলা সেতু আমরা দেশে প্রথম নির্মাণ করলাম। এটাও কিন্তু একটা রেকর্ড।

কীভাবে এটা করলাম? ট্রেনের পথ কম ওপরে থাকবে নাকি নিচে? আমরা সেতুর অ্যাপ্রোচে সাধারণ গাড়িতে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঢাল (স্লোপ) সামলাতে পারি। অর্থাৎ কোনো গাড়ি ১০০ মিটার গেলে ৫ মিটার ওপরে উঠবে। অন্যদিকে ট্রেন চলার জন্য মাত্র ০ দশমিক ৫০ শতাংশ ঢালে চাপ সামলানো যায়। তাই হিসাব করলে বোঝা যায়, ট্রেনকে সেতুর ওপরের অংশ দিয়ে নিতে হলে প্রায় তিন হাজার মিটার দূর থেকে রাস্তার ঢাল উঁচু করে ট্রেনকে সেতুতে ওঠার ব্যবস্থা করতে হতো, যা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। তাই আমরা সেতুর নিচের অংশে ট্রেন চলাচল এবং ওপরের অংশে অন্য যানবাহন চলার ব্যবস্থা করি। এতে রেললাইনের উচ্চতা কম লেগেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও যেসব সেতুতে মোটর ও রেল চলাচল করে, তাতে মোটরযানকে ওপরে ও রেলপথ নিচ দিয়ে নেওয়া হয়। এতে ব্যয়ভার কমে আসে। ভারত ও জাপানে রেলপথ সেতুর নিচের অংশেই করা হয়েছে এসব বিষয় চিন্তা করে। সেতুকে টেকসই করার জন্যও এ ধরনের ব্যবস্থা দরকার।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো নদীশাসন। কারণ, ১০০ বছরে নদীর পাড় ভাঙতে ভাঙতে যদি নদীটাই সেতুর বাইরে চলে যায়, তাহলে তো সেতুই ব্যর্থ। তাই সেতুর দুই পাশে নদীর তীর এমন মজবুত করা হয়েছে, যেন সহজে তীর না ভাঙে। একেই বলা হয় নদীশাসন। এ জন্য সেতুর দুই পাশে নদীর ঢালে প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ জিও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। পাথর ফেলা হয়েছে প্রায় সোয়া ১০ লাখ ঘনমিটার।

এখানে আরেকটি হিসাব করা হয়েছে। নদীপাড়ের ঢাল কোথায় কত ডিগ্রি কোণে তৈরি করলে নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, সেটা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করে নদীশাসন করা হয়েছে। এ জন্য স্যাটেলাইট থেকে বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও নিখুঁত হিসাব বের করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।