শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ আর নেই

কাশ ফুলের মতো সাদা চুল ছিল তাঁর। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি ছিলেন নিভৃতে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরের শুভ্র আলো ফোটার আগেই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন সেই নিভৃতচারী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কবি বেলাল মোহাম্মদ।
ভোর চারটা ১০ মিনিটে তিনি রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
বেলাল মোহাম্মদের বন্ধু ও চিকিৎসক মোহাম্মদ শফির মেয়ে রুমানা শফি জানান, সোমবার রাত ১০টার পর থেকে তিনি আর চোখ মেলেননি।
বেলাল মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরেই কিডনিসহ নানা অসুখে ভুগছিলেন। তবে গত সপ্তাহে তিনি হঠাৎ করেই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সোমবার দুপুরে তিনি বন্ধুর বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
কবি বেলাল মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা মাহমুদা খানম ও বাবা মোহাম্মদ ইয়াকুব। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম চট্টগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি দৈনিক আজাদীতে উপসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ওই বছরই রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রে পাণ্ডুলিপি লেখক হিসেবে যোগ দেন। উত্তাল একাত্তরেও তিনি একই কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। একাত্তরের ২৬ মার্চ বেলাল মোহাম্মদসহ কয়েকজন মিলে প্রথম কালুরঘাটের বেতার স্টেশনে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার’ নামে বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই বেতারকেন্দ্র থেকেই আসে স্বাধীনতার ঘোষণা।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। নির্লোভ এই শব্দসৈনিক স্বাধীনতা পদকটি বাংলাদেশ বেতারকে উৎসর্গ করেন এবং নগদ অর্থ দিয়ে সন্দ্বীপে নিজ গ্রামে কমরেড মুজাফ্ফর আহ্মদ-লালমোহন সেন ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে আধুনিক ওস্তাদ ও অন্যান্য গল্পচর্চা, মরণ-উত্তর, গল্পের সংলাপ, স্বপ্নসাধ ক্রসবাঁধ, যাবো কেষ্টপুর, পংক্তিমালা-যুদ্ধপূর্ব, যুদ্ধোত্তর, প্রবর্তক ইত্যাদি।
১৯৭৩ সালে বেলাল মোহাম্মদের স্ত্রী মারা যান। এরপর জীবনে আসে আরেকটি বড় ধাক্কা। ১৯৯৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে মারা যান। সেই থেকে একেবারে ভেঙে পড়েন গুণী এই সংগঠক। শেষ জীবনে বড্ড একাকী জীবন যাপন করেছিলেন তিনি। অবনতি হয় শারীরিক অবস্থারও।
বেলাল মোহাম্মদ থাকতেন উত্তরায় বড় ভাই আবু আইয়ুব মোহাম্মদ ইউসুফের সঙ্গে। গতকাল উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ভাইয়ের বাসভবনসংলগ্ন বায়তুল আমান জামে মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ জানান, আজ বুধবার বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আনা হবে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর জানাজার পর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মরদেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা হবে।
কবি বেলাল মোহাম্মদ বহু গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী শোক প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তি কবি বেলাল মোহাম্মদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।