শাজনীনকে হত্যা ঠান্ডা মাথার খুন : আপিল বিভাগ

নিজ বাড়িতে শাজনীন তাসনিম রহমানকে হত্যার ঘটনা ঠান্ডা মাথার খুন বলে উল্লেখ করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে বলা হয়, এটি ছিল ঠান্ডা মাথায় খুন এবং যেখানে নিষ্পাপ ও অসহায় এক মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়, যা ছিল বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষোচিত কাজ।

প্রায় দুই দশক আগে গুলশানের নিজ বাড়িতে শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আসামি শহীদের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন মত এসেছে। ঘটনার সময় শাজনীনের বাড়ির গৃহভৃত্য ছিলেন আসামি শহিদুল ইসলাম ওরফে শহীদ।

এর আগে গত ৫ মার্চ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগ আসামি শহীদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে এ রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে আসামি শহীদের আইনি লড়াইয়ের ধাপ শেষ হলো। ২৩ এপ্রিল সাত পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টির সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২৪ এপ্রিল রায়ের অনুলিপি বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়।

এই মামলায় আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান। পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুসারে সর্বোচ্চ আদালতের রায় বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সাজা পরোয়ানা কারাগারে যাবে। বিধি অনুসারে কারা কর্তৃপক্ষ তা হাতে পাওয়ার পর ১৪ দিনের আগে নয়, ২১ দিনের পরে নয়—সময়ের মধ্যে দণ্ড কার্যকর করবে। এ ছাড়া সাজা পরোয়ানা পাওয়ার পর আসামি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না, তা কারা কর্তৃপক্ষ আসামির কাছে জানতে চাইবে। আসামি যদি প্রাণভিক্ষা না চান বা রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিলে ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দণ্ড কার্যকর হবে।

রায়ে বলা হয়, অপরাধের ধরন থেকে দেখা যায়, আবেদনকারী (শহীদ) কোনো ধরনের সহানুভূতি পেতে পারেন না। মৃত্যুদণ্ড কমানোর মতো কোনো বিশেষ পরিস্থিতি ও রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব-মৃত্যুদণ্ড
কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার যুক্তি হতে পারে না, যেখানে পূর্বপরিকল্পিত, কাপুরুষোচিত এবং সব মানবিক যুক্তির বাইরে আসামি অপরাধ সংঘটন করেছেন। আমরা আবেদনের কোনো সারবত্তা খুঁজে পাইনি। তাই রিভিউ আবেদনটি খারিজ করা হলো।

রায়ে বলা হয়, ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে শাজনীন, ভাগ্যহত ১৫ বছর বয়সী এক মেয়েকে তার শয়নকক্ষে ধর্ষণের পর অত্যন্ত অমানবিক ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যা ছিল তার জন্য অত্যন্ত নিরাপদ স্থান। ...এটি হচ্ছে সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং অপরাধের নৃশংসতা বিচারিক বিবেকে আঘাত করে, যেখানে আদালতের দায়িত্ব মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা। আবেদনকারী (আসামি) ছিলেন ভিকটিমের গৃহভৃত্য। তাঁর দায়িত্ব ছিল পরিবারের সদস্যের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা দেওয়া, পরিবর্তে লালসার বশে এমনকি ১৫ বছর বয়সী শিশুকে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করতে কোনো দ্বিধা করা হয়নি। এটি ছিল ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। তাই নমনীয় দণ্ড দেওয়া হলে তা হবে ভুল জায়গায় সহানুভূতির প্রদর্শন ও ন্যায়বিচারের ব্যত্যয়।

শাজনীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার হয় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিচারিক আদালত শাজনীনকে ধর্ষণ ও খুনের পরিকল্পনা এবং সহযোগিতার দায়ে ছয় আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন। তাঁরা হলেন শাজনীনের বাড়ির গৃহভৃত্য শহীদ, বাড়ির সংস্কারকাজের দায়িত্ব পালনকারী ঠিকাদার সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন হাসান ও তাঁর সহকারী বাদল, বাড়ির গৃহপরিচারিকা দুই বোন এস্তেমা খাতুন (মিনু) ও পারভীন এবং কাঠমিস্ত্রি শনিরাম মণ্ডল।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর এই মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিরাও আপিল করেন। ২০০৬ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ে শনিরামকে ছাড়া বাকি পাঁচ আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন চার আসামি হাসান, বাদল, মিনু ও পারভীন। ফাঁসির আদেশ পাওয়া আরেক আসামি শহীদ জেল আপিল করেন। আপিল বিভাগ চার আসামির আপিল মঞ্জুর ও শহীদের জেল আপিল খারিজ করে গত বছরের ২ আগস্ট রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন শহীদ, যা ৫ মার্চ আপিল বিভাগে খারিজ হয়।

শাজনীন তাসনিম রহমানের বাবা লতিফুর রহমান ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান।