বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমমান পুরোপুরি নিশ্চিত হোক, এমনটাই চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে শ্রমমান নিশ্চিত করতে গিয়ে শিল্পের ক্ষতি হোক, এটি চায় না ওবামা প্রশাসন।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারি সংলাপের প্রথম দিনের আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদল এ আভাস দিয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের একাধিক সদস্য প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দিনের এ বৈঠক শুরু হয়েছে।
শ্রমমান ছাড়াও প্রথম দিনের বৈঠকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রসঙ্গটি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে চেয়েছে।
প্রথম দিনের বৈঠকে তিনটি কর্ম-অধিবেশনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সুশাসন ও উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এর মধ্যে শ্রমমানের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক সমন্বয় ও যোগাযোগ নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও তা হয়নি। আজ সোমবার বৈঠকের শেষ দিনে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। তেমনি রাজনীতির প্রসঙ্গও প্রথম দিনের আলোচনায় আসেনি।
গুরুত্ব শ্রমমানে: বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কর্ম-অধিবেশনে শ্রমমানের বিষয়ে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, শ্রমমানের উন্নয়নে বিদ্যমান শ্রম আইন সংশোধনসহ এ পর্যন্ত নেওয়া সরকারের পদক্ষেপ সঠিক পথেই রয়েছে। শ্রম আইন সংশোধন করে তা সংসদে উত্থাপনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশ তার মতো করেই নেবে। তবে এসব পদক্ষেপ এমনভাবে নিতে হবে, যাতে করে বাংলাদেশ দ্রুত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’ (উন্নত শ্রম কর্মসূচি) চালু করতে পারে।
শ্রমমানের উন্নয়নে বাংলাদেশ মালিক-শ্রমিকের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের ভূমিকা আছে বলে মনে করে। এ প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমমান নিশ্চিত করতে ক্রেতাদের সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পাশাপাশি ক্রেতাদের নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করতে চায়। বাংলাদেশের এ প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের সম্মেলন আয়োজনে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন: সুশাসন ও উন্নয়নবিষয়ক কর্ম-অধিবেশনে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় গত বছরের সর্বশেষ জাতিগত সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া মানবিক সহায়তার প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের কাছে এ ধরনের সহায়তা আশা করেছে তারা। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মিয়ানমার সফর এবং ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা যে বক্তৃতা করেছেন, তাতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে সমস্যা সমাধানে দায়িত্ব নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কার্যত এটি বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করে।
এ সময় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা দমনের পাশাপাশি সেখানকার আর্থসামাজিক সমস্যা সমধানে বাংলাদেশ তার প্রস্তাব তুলে ধরুক। সেই অনুযায়ী সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রসঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদল জানায়, মিয়ানমারকে সুস্পষ্টভাবে এ বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে এই অঞ্চলের উন্নয়নের আদর্শ বাংলাদেশ। কাজেই প্রতিবেশী বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে সে তার উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সফলকাম হবে না।
শেষ কর্ম-অধিবেশনে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুই পক্ষ একমত পোষণ করে।
অন্যান্য অধিবেশন: এদিকে এ সংলাপের অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘প্রাইভেট সেক্টর ফোরাম’ নামে পৃথক তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) উদ্যোগে ঢাকা চেম্বার ভবনে এসব আলোচনা হয়। এর মধ্যে শ্রমিক অধিকার বিষয়ে অনুষ্ঠিত একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রমবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্যারেন হানরাহান।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি বলেন, শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পোশাকশিল্পের সমস্যাগুলো বিস্তারিতভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কারখানাগুলো পরিদর্শনের জন্য লম্বা করণীয় (চেকলিস্ট) তৈরি করতে হবে। সরকার যেন এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়, সে ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ রাখতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ক্রেতাগোষ্ঠীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছে।
অধিবেশনে বাংলাদেশে শ্রম অধিকারের ওপর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান। আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রায় রমেশ চন্দ্র বলেন, অনেক ক্রেতা অনৈতিক ক্রয়-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তারা এ দেশের শ্রমিকদের দুর্দশার দায় এড়াতে পারে না।
অনুষ্ঠানে ক্রেতাদের পক্ষে উপস্থিত গ্যাপের প্রতিনিধি ড্যারিল কনুসেন বলেন, সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে সরকার, উদ্যোক্তা, ক্রেতা—প্রত্যেকেরই দায়িত্ব আছে।
সংলাপে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে পারে’ শীর্ষক আরেক অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন নতুন ব্লকের জন্য পিএসসি এবং একটি এনার্জি গবেষণা কাউন্সিল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ এবং অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।
অধিবেশনে কো-চেয়ার ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ট্রান্সফরমেশন-সংক্রান্ত ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রবার্ট আইকরড ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স) এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম তামিম।
শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জেফ্রি স্ট্রং বলেন, সমুদ্রবক্ষসহ নতুন নতুন এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ কাজে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসের দামও বাড়াতে হবে। পিএসসির অধীনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সুযোগ দিতে হবে তৃতীয় পক্ষের কাছে তাঁদের অংশের গ্যাস সরাসরি বিক্রি করার।