শ্রীহীন ফরাশগঞ্জের 'বড়বাড়ি'

বাড়িটি যেন জটাধারী বুড়ো। কিংবা ছালবাকলহীন বয়সী কোনো বৃক্ষ। রাগে ফুঁসছে, কখনো বিড়বিড় করে বকছে। কিন্তু তাকে দেখার বা তার কথা শোনার যেন কেউ নেই। বাড়িটির সামনে খানিক দাঁড়িয়ে, ভেতরে ঢুকে একক্ষ–ওকক্ষ ঘুরে এমনই মনে হতে পারে।
ফরাশগঞ্জের ‘বড়বাড়ি’ বলেই তার পরিচয়। এখন সে শ্রীহীন, কিন্তু এককালে যে বিশেষ কিছু ছিল, তার চিহ্ন আজও বর্তমান।
ফরাসিদের বসতির কারণে ফরাশগঞ্জের সুখ্যাতি এ অঞ্চলে ইংরেজ আধিপত্য কায়েমের আগে থেকেই। ফরাসিরাই এখানে মসলার ব্যবসা শুরু করেছিল। এখনো ফরাশগঞ্জে সেই মসলার কারবার। সম্প্রতি এক দুপুরে পুরান ঢাকার এই জনপদে ঢুকলে স্বাগত জানায় মরিচ-হলুদের ঝাঁজালো ঘ্রাণ। জায়গাটার নাম বি কে দাশ রোড। এককালের সমৃদ্ধ আবাসিক এলাকা এখন ক্ষয়িষ্ণু। কাছেই স্রোতস্বিনী বুড়িগঙ্গা।
এই বি কে দাশ রোডের ৪৪ নম্বর বাড়িটিই বড়বাড়ি। বি কে দাশ অর্থাৎ বসন্ত কুমার দাশ আর তাঁর ভাই প্রসন্ন কুমার দাশ। প্রসন্ন কুমার ছিলেন বরিশাল বড়ঘর এস্টেটের জমিদার। বিংশ শতাব্দীর শুরুর কথা। ঢাকায় একটি বাড়ি করলেন থাকার জন্য। সেই বাড়িটিই এই বড়বাড়ি।
বড়বাড়িতে ঢোকার আগেই ঘরর...ঘরর... আওয়াজ। নিচতলা, দোতলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে একটি বই বাঁধাই প্রতিষ্ঠানকে। সকাল-বিকেল ভারী মেশিনে বই বাঁধাইয়ের কাজ চলছে। এ আওয়াজেই কেঁপে কেঁপে উঠছে বাড়িটি। আর তিনতলায় বহু বছর ধরে ভাড়া থাকে একটি পরিবার।
নব্য ধ্রুপদি নকশার এ বাড়িটি প্রসন্ন কুমার দাশ তৈরি করেছিলেন ১৯০৫ বা ১৯১০ সালের দিকে। এ বাড়ির নকশার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে ফরাসি রোকোকো, মাল্টি কোর্টইয়ার্ড বা একাধিক উঠান, এলিভেটেড ওয়াকওয়ে। এ বাড়িটায় মোট ভবন দুটি, তিনটির মতো বারান্দা। কক্ষ সাকল্যে ৯ থেকে ১০টি। বাড়িটার সামনের অংশটুকু দ্বিতল, পেছনটা তিনতলা। শোনা যায় উঠানগুলোর কোনোটি ছিল পরিবারের সদস্যদের জন্য, কোনোটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়কদের জন্য।
বাড়িটার পাশেই আরেকটি বাড়ি, যার মালিক ছিলেন প্রসন্নের ভাই বসন্ত কুমার দাশ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পুরান ঢাকার অনেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার ভারতের কলকাতায় চলে যায়। আবার কলকাতা থেকে অনেক মুসলিম আসেন ঢাকায়। এ সময় কোনো কোনো বনেদি পরিবারের মধ্যে বাড়ি-ভূসম্পত্তির মালিকানা বদল করার সুযোগ ঘটে। বড়বাড়ির মালিক প্রসন্ন কুমার দাশও পেরেছিলেন। বাড়িটি কিনে নেয় ঢাকার একটি পরিবার।
ঐতিহ্যবাহী বাড়িটির এখন ভগ্নদশা। একটি অংশ ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। চারপাশ দেখে মনে হয়, যেকোনো সময় বাড়িটি ভেঙে পড়তে পারে বা ভেঙে ফেলা হতে পারে।
এত দিন বড়বাড়িসহ বি কে দাশ রোডের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের সংরক্ষিত সম্পত্তি ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর রাজউকের সর্বশেষ গেজেটে এখানকার বাড়িগুলো সংরক্ষিত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ পড়ে। যা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুরান ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা।
আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাইমুর ইসলাম বলছিলেন, যদিও বড়বাড়ি এখন একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি তবু এ রকম শতবর্ষী বাড়ি ঢাকার ঐতিহ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এ রকম বাড়ি না ভেঙে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেই চেষ্টাই বরং করা উচিত।