ষষ্ঠ শ্রেণিতে এক লাফে ১৪ বই!

শুধু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, সরকারিভাবেও শিক্ষার্থীদের ওপর বই ও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণিতে যেখানে শিশুরা ৬টি বই পড়ছে, সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে ১৩টি বিষয়ে ১৪টি বই পড়তে হচ্ছে। এসব বই দিচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এসবের মধ্যে নতুন চালু হওয়া কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর জন্য বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নেই। ফলে সিলেবাস শেষ করতে ও চাপ সামলাতে বাধ্য হয়ে কোচিং-প্রাইভেটমুখী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, হাতে তুলে নিচ্ছে সহায়ক বই যা নোট-গাইডের বিকল্প। এদিকে শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনা করে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিলেও তা মানা হয়নি। নতুন বছরেও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ১৪টি বই তুলে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বলছেন, ১৪টি বই নিয়ে ১৩টি পরীক্ষা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ পড়ে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বলেন, পঞ্চম শ্রেণির একটি শিশু নভেম্বর মাসে ৬টি বিষয়ে পরীক্ষা দিল, সেখানে জানুয়ারিতে এসে এক লাফে ১৪টি বই তুলে দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়ছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে এত বই দরকার ছিল না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যেত।
গত ২৬ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মুক্ত আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, এক শ্রেণি থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সময় শিক্ষার্থীর বয়স বাড়ে এক বছর। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বেড়ে যায় অনেক। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য এত বড় সিলেবাস আত্মস্থ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই বয়স বিবেচনায় শ্রেণিভেদে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে সামঞ্জস্য আনা যেতে পারে।
এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২৮ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠি দিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানায়, প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।
কিন্তু এবারও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ১৪টি বই দেওয়া হয়েছে। বইগুলো হলো চারুপাঠ (বাংলা প্রথম পত্র), বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি (বাংলা দ্বিতীয় পত্র), আনন্দ পাঠ্য (বাংলা দ্রুতপঠন), ইংলিশ ফর টুডে (ইংরেজি প্রথম পত্র), ইংলিশ গ্রামার অ্যান্ড কম্পোজিশন (ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র), গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা বা গার্হস্থ্যবিজ্ঞান এবং চারু ও কারুকলা। অথচ নবম-দশম শ্রেণিতেও বই ১৪টি রয়েছে।
সপ্তম শ্রেণিতে ওঠা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র সামিউল হক প্রথম আলোকে বলে, সে পঞ্চম শ্রেণি শেষে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর হঠাৎ করে বেশি বইয়ের কারণে চাপে পড়েছিল। পরে বাসায় গৃহশিক্ষক ও কোচিংয়ে পড়তে হয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা একই স্কুলের ছাত্র রাফসেন জানি বলল, এত বেশি বইয়ের কারণে তারও চাপ মনে হচ্ছে। তার বাবা কামাল হোসেন বললেন, এত বিষয় রাখার কোনো মানে নেই।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র বলেছে, নতুন বিষয় হিসেবে যুক্ত হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলা, জীবনমুখী শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও উপকরণ নেই। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যালয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলা, জীবনমুখী শিক্ষা বিষয়ে পদই অনুমোদন নেই।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বইয়ে বেশি সমস্যা নয়, মূল সমস্যা হলো পরীক্ষা। তিনি মনে করেন, কয়েকটি বিষয়ে বিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত। বই ও পরীক্ষা কীভাবে কমানো যায়, সে জন্য শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।