সচিবের কক্ষের সামনেই অনশন

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা শেখ আবদুল বাতেন চাকরিতে ‘হয়রানির’ প্রতিবাদে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোজাম্মেল হক খানের কক্ষের সামনে অনশন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত রাজশাহী-৩ আসনের সাংসদ মো. আয়েনউদ্দীন ওই কর্মকর্তাকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি সেখানেই বসে থাকেন। প্রায় ১৫ মিনিট পর অনেকটা জোর করেই ওই কর্মকর্তারা তাঁকে জ্যেষ্ঠ সচিবের একান্ত সচিবের (পিএস) কক্ষে নিয়ে যান।

ঘটনার সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান কক্ষে ছিলেন না। ওই সময় তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় ছিলেন। পরে সচিব কক্ষে ফিরলে শেখ আবদুল বাতেন আবার অনশনে বসেন। এ সময় জ্যেষ্ঠ সচিব তাঁর কক্ষ থেকে বের হয়ে আবদুল বাতেনকে তাঁর কক্ষে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় আবদুল বাতেন সচিবকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘স্যার, দীর্ঘদিন আপনার কক্ষে বসেছি। আমার সমস্যার কোনো সুরাহা আপনি করতে পারেননি। তাই আপনার কক্ষে যাব না। এখানে বসেই প্রতিবাদ করব। আমাকে এখান থেকে সরাতে হলে পুলিশ দিয়ে সরাতে হবে।’

এ সময় জনপ্রশাসনসচিব বলেন, ‘আপনি একজন ক্যাডার কর্মকর্তা, এখানে বসে থাকা আপনাকে মানায় না।’ এটা বলে শেখ আবদুল বাতেনের হাত ধরেন সচিব মোজাম্মেল হক খান। এরপর শেখ আবদুল বাতেন সচিবের সঙ্গে তাঁর কক্ষে যান এবং দীর্ঘ সময় কথা বলেন।

অনশনের সময় শেখ আবদুল বাতেন প্রথম আলোকে জানান, তিনি বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। প্রেষণে ট্যারিফ কমিশনে কর্মরত অবস্থায় স্নাতকোত্তর পড়তে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৯৭ সালে স্নাতকোত্তর শেষ হলে পিএইচডি করার অনুমতি চান। ট্যারিফ কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর মৌখিকভাবে পিএইচডি করার অনুমতি দেন। এরপর তিনি ট্যারিফ কমিশন থেকে বদলি হন। ২০১৬ সালে আধা সরকারি পত্রে (ডিও) মহীউদ্দীন খান তাঁকে অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকারও করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পিএইচডির কাজে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় পারিবারিক বিরোধের জের ধরে আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশে আবদুল বাতেনের গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। তাঁর দুই নাবালক সন্তানকে স্ত্রী গ্রহণ করেন।

আবদুল বাতেন জানান, দেশে ফিরে সন্তানদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন তিনি। ২০০৪ সালে ট্যারিফ কমিশনে যোগদান করতে গেলে কমিশন থেকে তাঁকে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে (বর্তমান নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে যোগাযোগ করার পর ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ৭ বছর ৮ মাস ১২ দিন অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে কেন তাঁকে চাকিরচ্যুত করা হবে না তার কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কৈফিয়ত দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন জবাব দেয়নি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়। তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় তাঁর পক্ষেই মত দেয়। এরপরও সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালে তাঁকে পাঁচ বছরের বেশি সময় অনুপস্থিত থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর চাকরি অবসানের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে তাঁকে প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শেখ আবদুল বাতেন মুক্তিযোদ্ধা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর চাকরির ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই অবস্থায় চাকরিতে পুনর্বহালের কোনো সুযোগ না থাকায় তিনি চাকরি স্বয়ংক্রিয় আবসানের আদেশ বাতিল করে চাকরি থেকে অবসর, অবসর-পরবর্তী ছুটি ও আর্থিক সুবিধা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নিচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পুরো বিষয় ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রপতির কাছে ফাইল উপস্থাপন করা হবে। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা-ই বাস্তবায়ন করা হবে।

শেখ আবদুল বাতেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় আমার পক্ষে মতামত দিলেও জনপ্রশাসন আমাকে হয়রানি করছে। আমি ন্যায়বিচার না পেয়ে আজ (গতকাল) অনশন করলাম। এরপরও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হয়ে আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা সনদ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হয়রানির প্রতিবাদ করব।’