৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়। ‘সচেতন হই, প্রচার করি, যত্ন নিই: থ্যালাসেমিয়াবিষয়ক জ্ঞান উন্নয়নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করি’ এই প্রতিপাদ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি পালন করেছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, সন্ধানী, মেডিসিন ক্লাব ও প্ল্যাটফর্ম।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি অনলাইন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আজগর আলী হাসপাতালের অধ্যাপক, রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনজুর মোরশেদ। তিনি দিবসটির প্রতিপাদ্য বিশ্লেষণ, থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ডা. মনজুর মোরশেদ জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে রক্তে লোহিত কণিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না। ফলে তাদের মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা প্রতি মাসে এক বা দুই ব্যাগ রক্ত গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। চিকিৎসার অভাবে এই রোগীরা রক্তশূন্যতায় মারা যায়।
শিশু জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের লক্ষণগুলো হলো—ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন ইনফেকশন, শিশুর ওজন বৃদ্ধি না হওয়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি।
থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনো সহজলভ্য স্থায়ী চিকিৎসা নেই। এ রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, শুধু তখনই সন্তানদের এ রোগ হতে পারে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দুজনের একজন যদি বাহক হন এবং অন্যজন সুস্থ হন, তাহলে কখনো এ রোগ হবে না। তাই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামে একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়া বাহক কি না নির্ণয় করা যায়। ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষক ও সরকারের সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা ফাউন্ডেশনে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যদি বিভাগীয় শহরগুলোতে ফাউন্ডেশনের শাখা করা যায় তাহলে রোগীদের কষ্ট লাঘব হবে। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরেন এবং এ রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার ও ফাউন্ডেশনকে আহ্বান জানান।
ফেসবুক লাইভের প্রশ্নোত্তর পর্বে সহযোগী অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। সর্বাধুনিক চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গবেষণা করছে। অ্যালোজেনিক বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে এ রোগ ভালো হয়। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অপারেশনটির জন্য ম্যাচ-ডোনারের অভাব এবং চিকিৎসার খরচও ব্যয়বহুল। বিশ্বে জিনথেরাপি চিকিৎসাটি বেশ এগিয়েছে।
এ রোগের কিছু কিছু নতুন ওষুধ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন রোগীর শরীরে ব্লাড ট্রান্সফিউশন কমিয়ে ওষুধ দিয়ে কীভাবে হিমোগ্লোবিন ৯ বা ১০ রাখা যায়। চূড়ান্তভাবে জিনথেরাপি ও খাবার ওষুধ নিশ্চিত হলে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা উপকৃত হবেন।’
এ ছাড়া সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সন্ধানী কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিশীত কুমার মণ্ডল, মেডিকেল ক্লাবের সভাপতি ফয়সাল মাহমুদ প্রমিজ এবং প্ল্যাটফর্মের সভাপতি নাজমুল আবেদিন নাসিব। তাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কীভাবে সহযোগিতা করছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানান।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে দেওয়া তাঁর বাণীতে বলেন, বাংলাদেশে এই রোগের জিনবাহকের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বাহকে বাহকে বিয়ে হলে দম্পতির সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়েরা তাঁদের বিবাহের পূর্বে এই রোগের জিনবাহক কি না, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।