সপ্তাহে এক দিন গ্যাস দিয়ে মাসের বিল!

পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারের গ্যাসে পৃথক চুলায় রান্না করছেন এক নারী। ছবিটি গত মঙ্গলবার সকালে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার গঙ্গাধরপট্টি মহল্লা থেকে তোলা l প্রথম আলো
পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারের গ্যাসে পৃথক চুলায় রান্না করছেন এক নারী। ছবিটি গত মঙ্গলবার সকালে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার গঙ্গাধরপট্টি মহল্লা থেকে তোলা l প্রথম আলো

 পাঁচ বছর ধরে তিতাসের যন্ত্রণায় মানিকগঞ্জবাসী  প্রতি ঘরে দুই ধরনের চুলা  জ্বালানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম

‘কী যে বিপদ! কইলেও আমাদের কষ্ট পুরা বুঝতে পারবেন না। সপ্তাহে কেবল এক দিন শুক্রবারে একটু গ্যাস আসে। কোনো কোনো শুক্রবারে আসেও না। গত ১৪ জুলাই শুক্রবার চুলায় গ্যাস এসেছিল দুই সপ্তাহ পর।’ মানিকগঞ্জ শহরের বেউথা মহল্লার গৃহবধূ শারমিন আক্তার বলছিলেন গ্যাস নিয়ে তাঁর ভোগান্তির কথা।
মানিকগঞ্জ শহরে এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দুই ধরনের গ্যাসের চুলা রাখতে হচ্ছে। তিতাস গ্যাসের জন্য একটি এবং এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য আরেকটি চুলা। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বার্নারের চুলার জন্য তিতাস মাসে বিল নেয় ৯৫০ টাকা। আর এক পরিবারে মাসে গড়ে দেড় সিলিন্ডার (১৮ কেজি) করে গ্যাস লাগে। এর বাজারমূল্য ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস না দিলেও মাসে স্থানীয় গ্রাহকদের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকা বিল আদায় করছে।
মানিকগঞ্জের আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস না দিয়েও বিল নেওয়া অনৈতিক হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন) এইচ এম আলী আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৈতিকতার বিষয়টি এককভাবে আমি বলতে পারি না। তবে এটি একটি সিস্টেম (ব্যবস্থা)। সেই অনুসারে গ্রাহকদের নির্ধারিত বিল দিতে হয়।’
মানিকগঞ্জ শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, শহরবাসীর মূল যন্ত্রণা চুলায় গ্যাস না থাকা। বছর পাঁচেক ধরে চলছে এই গ্যাস–সংকট। ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথম দিকে চুলায় গ্যাসের চাপ থাকত কম। এরপরে রাতে অথবা দিনে এক বেলা করে গ্যাস বন্ধ রাখা হতো। ক্রমে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এখন গ্যাস আসে সপ্তাহে মাত্র এক দিন, শুক্রবার। তা–ও মাত্র ঘণ্টা তিন-চারেকের জন্য। অথচ বিল দিতে হচ্ছে পুরো মাসের।
ক্ষুব্ধ শারমিন আক্তার বলছিলেন, ‘বুঝি তো, ইচ্ছা কইরা বন্ধ রাখে। গ্যাস যদি না–ই থাকে, তাইলে শুক্রবারে আসে কই থেইকা?’ তিনি জানালেন, সেদিন (১৪ জুলাই) সকাল ১০টার পরে গ্যাস এসেছিল, বেলা তিনটার সময় বন্ধ হয়ে গেছে। চাপও কম ছিল, কোনোমতে ভাত আর একটি তরকারি রান্না করতে পেরেছেন তিনি। নিরুপায় হয়ে অনেক দিন থেকেই সিলিন্ডারের এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন তিনি। প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত। একটি সিলিন্ডার ১৮ থেকে ২৬ দিন পর্যন্ত যায়। মেহমান এলে কোনো মাসে দুটিও লাগে। গড়ে দুই মাসে তাঁদের পাঁচ সদস্যের পরিবারে তিনটি সিলিন্ডার লাগে। উপরন্তু প্রতি মাসে ঠিকই ৯৫০ টাকা করে গ্যাসের বিল দিতে হয়। সিলিন্ডারের এলপি গ্যাসের জন্য আলাদা করে চুলাও কিনতে হয়েছে।
ভুলজয়রা মহল্লার রত্না বেগম প্রথম আলোকে বললেন, ঈদের পরে সব মিলিয়ে তিন দিন গ্যাস পেয়েছেন। তাঁর স্বামী শফিকুল ইসলামের মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মোটরগাড়ি মেরামতের গ্যারেজ। পরিবারের পাঁচ সদস্য, গ্যারেজের তিন শ্রমিকসহ আটজনের তিন বেলা রান্না করতে হয়। প্রতি মাসে তাঁদের দুটি করে সিলিন্ডার কিনতে হয় বলে জানালেন এই দম্পতি। দুই সিলিন্ডার কিনতে তাঁদের বাড়তি ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা খরচ হচ্ছে।
রোজার মাসে দিনের বেলায় গ্যাস ছিল না, গ্যাস এসেছে রাত দুইটায়, থেকেছে পাঁচটা পর্যন্ত। আইনজীবী রমেজা আক্তার বললেন, ‘একে রোজার মাস, তার ওপর আমাদের মতো কর্মজীবী নারীদের সারা দিন কাজ করে এসে মাঝরাতে রান্না করতে যাওয়া যে কী কষ্টের, তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবেন না। গ্যাসের জন্য আন্দোলন করেছি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছি। কিন্তু কিছুই হয় না। দিনে দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’
জেলা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহক (বিল নির্ধারিত) সংখ্যা ১২ হাজার ১০১। তাঁরা মাসে গড়ে ৯০ লাখ টাকার বিল দেন। আর মিটারযুক্ত আবাসিক গ্রাহক (হাসপাতালসহ বড় কয়েক ধরনের প্রতিষ্ঠান) সংখ্যা ৫৫, তাদের বিল আসে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা।
গ্যাস–সংকটের কারণ সম্পর্কে জেলা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপব্যবস্থাপক শাকিল মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার আশুলিয়া থেকে সঞ্চালন পাইপলাইনের মাধ্যমে মানিকগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই—এসব এলাকায় অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার চাহিদা মেটানোর পর মানিকগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এ কারণে জেলায় গ্যাস–সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
গ্যাসের এই সংকট নিরসনের জন্য একটি বিকল্প সঞ্চালন লাইন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে তিতাসের এই কর্মকর্তা জানান, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে ওই বিকল্প লাইনটি টানতে হবে। এ জন্য ২০১৪ সালে একটি প্রস্তাবও পেট্রোবাংলায় পাঠানো হয়েছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বলে তিনি জানান।
গ্যাসের সংকট থাকায় খোলাবাজারে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে কোনো কোনো বিক্রেতা বেশি দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জে যমুনা, বসুন্ধরা, বিএম এবং ওমেরা—এই চার প্রতিষ্ঠানের ১২ কেজি, ২০ কেজি ও ৩০ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিলারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১২ কেজির সিলিন্ডার খুচরা দাম ৯০০ টাকা, ২০ কেজির দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৩০ কেজির দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা। এ ছাড়া টোটাল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ১২ ও ১৫ কেজির সিলিন্ডার রয়েছে, এর দাম যথাক্রমে ৯৫০ টাকা ও ১ হাজার ৪০০ টাকা। আবাসিক ক্রেতারা সাধারণত ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনে থাকেন। চাহিদা বেশি থাকলে বা বাজারে সরবরাহ কম থাকলে প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হয়।
শহরের উত্তর সেওতা মহল্লার মাহবুব আলম প্রথম আলোকে জানান, গত রমজান মাসে তিনি শহরের খালপাড় এলাকার একটি দোকান থেকে ওমেরার ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ৯৫০ টাকায়। উত্তর সেওতা কবরস্থান মসজিদ এলাকার হাদিউজ্জামান নামের আরেক ক্রেতা জানালেন, গত মাসে তিনি সিলিন্ডার কিনেছেন ৯৩০ টাকায়। রমজান মাসে এর কমে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। এখন অবশ্য নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে।
গ্যাস-সংকট সম্পর্কে মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র গাজী কামরুল হুদা বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে নগরবাসী এ নিয়ে প্রচণ্ড ভোগান্তিতে রয়েছেন। আমরা তিতাসের কর্মকর্তাদের অনেকবার বলেছি, প্রতিদিন রেশনিং পদ্ধতিতে অন্তত সকালে দুই ঘণ্টা ও রাতে দুই ঘণ্টা করে গ্যাস দেওয়া হোক। তাহলেও লোকে রান্না করে খেতে পারত। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’
গ্যাস–সংকট সম্পর্কে এইচ এম আলী আশরাফ বলেন, ‘আগে আমরা শুক্র-শনিবার গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা করতাম, এখন তা–ও দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস দিতে হচ্ছে, শিল্পকারখানায় দিতে হচ্ছে। কিন্তু গ্যাসের উৎপাদন বাড়েনি।’ এলএনজি এলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে এই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন। এলেঙ্গা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত বিকল্প গ্যাসলাইন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে।