সরকারের এক বছর: উন্নয়নে জোর, বিতর্ক-সমালোচনাও আছে

একটি দলের নেতৃত্বে টানা তিন মেয়াদে সরকার গঠন —যেকোনো বিচারে, যেকোনো দেশের জন্য নিশ্চয়ই বড় ঘটনা। একইভাবে মন্ত্রিসভা গঠনেও চমক দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৩১ জনই নতুন মুখ। চমকপ্রদ শুরুর কারণে প্রত্যাশাও বাড়ে। তবে শুরুর মতো বছরের শেষটা হলো না। রাজাকারের তালিকা নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সরকারকে। সব মিলিয়ে ২০১৯ সালে সরকারের অর্জন কী, জনগণেরই বা প্রাপ্তি কতটা—সেই প্রশ্নের উত্তর কঠিন। তবে কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে এর একটা চিত্র মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
ক্যাসিনো-জুয়াকাণ্ড এবং এর বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বরে শুদ্ধি অভিযান সরকার সম্পর্কে জনমনে ইতিবাচক বার্তা দেয়। যদিও এই অভিযান বেশি দিন টেকেনি। বরাবরের মতোই উন্নয়ন ও দুর্নীতি—এই দুটি শব্দ সমান্তরালে চলেছে।
গত এক দশকের মতোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থেকেছে। ফলে দ্রুত অগ্রসরমাণ অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের নাম সারা বিশ্বেই আলোচনায় ছিল। অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্প নেওয়া এবং চলমান প্রকল্পের অনেকগুলোর অগ্রগতিও ভালো ছিল।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করে সরকার। গত বছর সব কটি টেলিভিশন চ্যানেল এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সম্প্রচার শুরু করে।
আগের কয়েক বছরের সঙ্গে তুলনা করলে গায়েবি মামলা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার কিংবা নির্যাতন কম ছিল। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্রসফায়ারের মতো বিনা বিচারে হত্যা এবং ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বেশ জটিল সময় পার করেছে। গত বছর এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটেনি।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন সরকারি কর্মকর্তারা। নতুন মন্ত্রিসভা রাজনৈতিক অঙ্গনে হইচই ফেলেছে ঠিকই। কিন্তু জনপ্রশাসনে পদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পদোন্নতি, দলীয় সমর্থকদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার অভিযোগ গতবারও ছিল।
২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি এই সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। আগামীকাল প্রথম বর্ষপূর্তি। নতুন সরকার গঠনের পরই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নেমে পড়ে ঢাকার আশপাশে নদ–নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে। এই অভিযানে কয়েক শ স্থায়ী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু বছর শেষে এই সাফল্যের পুরোটা টেকেনি।
>সরকারের এক বছর: অর্জনের খাতায় বড় প্রকল্প ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি। শেষে এসে রাজাকারের তালিকা নিয়ে বিতর্ক।
গত ১ নভেম্বর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করে। নতুন এই আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সড়কের শৃঙ্খলার পরিপন্থী নানা অপরাধের শাস্তি ও জরিমানা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ আইনটির প্রতি সমর্থন জানালেও পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামেন। তাঁদের ধর্মঘটের মুখে সরকার আইনটি বাস্তবায়নে শিথিল অবস্থান নেয়।
বিজয় দিবসের আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের নামের তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এবং রণাঙ্গনের অনেক আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার নামও চলে আসে। ফলে সারা দেশেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম চলে আসায় দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা। পরে এই তালিকা স্থগিত করা হয়।
ক্রীড়াক্ষেত্রে এসএ গেমসে ১৯টি সোনা জিতে রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। তবে ক্রিকেট বিশ্বকাপে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি। উল্টো দেশের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নিষিদ্ধ হওয়া এবং নানা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শীর্ষ ক্রিকেটারদের ধর্মঘট সারা বিশ্বে আলোচনার জন্ম দেয়। মেয়েদের ক্রিকেট আশা দেখিয়েছে গেল বছর। ফুটবলে ভারতের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে জয় ছাড়া সার্বিক কোনো উন্নতি হয়নি।
গত বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে অনিয়ম সত্ত্বেও দলনিরপেক্ষ শিক্ষার্থীদের ভিপিসহ বেশ কিছু পদে জয় বড় আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর থেকে বেশ কবার আক্রমণের শিকার হন ভিপি নুরুল হক। অক্টোবরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের নেতারা পিটিয়ে মারলে সারা দেশে বিক্ষোভ হয়।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ। এরই ধারাবাহিকতায় টানা ১১ বছর বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর ফলে মাথাপিছু আয় ও জিডিপি বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে থাকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৮৬। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ৮.১৫–এ উন্নীত হয়েছে।
তবে গত বছর শেয়ারবাজার নতুন কোনো সুখবর দিতে পারেনি। ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার আশ্বাস দীর্ঘদিনের। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই আলোচনাই আছে। তবে সরকার তা গত অর্থবছরে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। রাজস্ব আয়েও গতি নেই, রপ্তানি খাতও ভালো অবস্থায় ছিল না।
অর্থনীতির প্রাণশক্তি প্রবাসী আয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত আছে, প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ। গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো আর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৩৩ কোটি ডলার। আগের বছর প্রবাসী আয় ছিল ১ হাজার ৫৫৩ কোটি ডলার।
অবকাঠামো খাতের মধ্যে গত এক বছরে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পগুলোর কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে পদ্মা সেতু ২০১৮ সালে ও মেট্রোরেল গত বছর চালু হওয়ার কথা ছিল। কোনোটাই নির্ধারিত সময়ে হয়নি বলে সময় বাড়ানো হয়েছে।
গত অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৬ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ৬.১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর অর্ধেকটা এখন দৃশ্যমান। মেট্রোরেলের জন্য নির্মিত উড়ালপথে রেললাইন বসানো শুরু হয়েছে। বিমানের বহরে বোয়িংয়ের দুটি উড়োজাহাজ যুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারের আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ও দোহাজারী-কক্সবাজার পথে নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের গত বছর অগ্রগতি ভালো ছিল।
মানবাধিকার ও ধর্ষণ
বছরজুড়েই ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা আলোচনায় ছিল। ধর্ষণের অভিযোগে কয়েকজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। মৃতদেহের শরীরে লেখা ছিল, ‘আমি...ধর্ষক, ইহাই আমার পরিণতি’। কোনো কোনো মৃতদেহের পাশে চিরকুট পাওয়া যায়, যাতে হত্যাকারী হিসেবে লেখা ছিল ‘হারকিউলিস’। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, গত বছরে দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। তাদের হিসাব বলছে, গত বছর সারা দেশে ১ হাজার ৪১৩ নারী ধর্ষিত হয়েছেন। আর ৩৮৮ জন মানুষ ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার’ হয়েছেন। গুমের অভিযোগের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও বছরজুড়ে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক ছিল’ বলে আসকের অভিমত। গত ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি-২০১৯: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ’ শিরোনামে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন আসক কর্মকর্তারা।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও দল বেঁধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৪১৩ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী এবং ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮১৮।
‘শুদ্ধি অভিযানের’ আশা শুরুতেই শেষ
১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে র্যাব অভিযান চালিয় বিপুল ক্যাসিনো-জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। একই সময় ওই ক্লাবের সভাপতি ও যুবলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে, এমনকি চট্টগ্রামসহ অনেক স্থানেই ক্যাসিনো ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চলে। এ সময় অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে ধরা হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা। জুয়া ও ক্যাসিনো-কাণ্ডের সঙ্গে যুবলীগ নেতাদের সরাসরি যুক্ত থাকার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এর জের ধরে যুবলীগের তখনকার চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হন যুবলীগের ঢাকা মহানগর শাখার সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী ওরফে সম্রাট। কারাবন্দী হন কথিত যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী ঠিকাদার জি কে শামীম। স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ নাথ সংগঠন থেকে বাদ পড়েন। সমালোচনার মুখে পড়েন কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা।
এই অভিযানে সরকারি দলের একাধিক সাংসদ ও নেতার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও তৎপর হয়। এটাকে অনেকেই ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবে আখ্যা দেন। দলীয় সরকারের আমলে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযান অনেকটাই ‘নজিরবিহীন’ বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে বাহ্বা জানায় সব মহল। কিন্তু এই অভিযান কোনো ঘোষণা ছাড়াই অল্প দিনের মধ্যে স্তিমিত হয়ে পড়ে।
পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা
কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসনের চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে পাঠাতে পারেনি।
চীনের সরাসরি মধ্যস্থতায় ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। দুটি উদ্যোগই ব্যর্থ হয়। ফলে গত বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) নিয়ে যায় আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে শুনানি হয়। এতে বাংলাদেশ সহায়তা করে। দ্রুত একটা অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
এর বাইরে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) এবং ভারতের লোকসভায় পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বাংলাদেশের জন্য কিছুটা হলেও অস্বস্তি তৈরি করে। গত অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্র উপকূলে রাডার স্থাপনের একটি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দেশবিরোধী বলে বক্তব্য-বিবৃতি দেয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকার পরও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ায় সরকারকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
দুর্নীতি-অনিয়ম
গত বছরে ব্যাপক সমালোচিত রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশ-কাণ্ড। সেখানে প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর প্রতিটি বালিশ আবাসিক ভবনের খাটে তোলার মজুরি দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। কভারসহ কমফোর্টারের (লেপ বা কম্বলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত) দাম ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। একইভাবে বিদেশি বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৬ টাকায়।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ভূমি খাতে দুর্নীতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাবরেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে সেবা পেতে প্রতিটি পদক্ষেপে সেবাগ্রহীতাদের ৫০০ থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর তথ্য অধিকারের আবেদনের ওপর গবেষণা করে টিআইবি বলেছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যাবে না এমনটা মেনে নিয়েছেন দেশের ৮৯ শতাংশ মানুষ। আর ঘুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে কোনো ফল পাওয়া যায় না বলে ৭৫ শতকরা মানুষ মনে করেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরটা ভালো-মন্দে মেশানো। প্রবৃদ্ধি-প্রবাসী আয় বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য সুখবর। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এর সুফল সব স্তর পাচ্ছে কি না। নিম্ন, নিম্নমধ্যবিত্ত এই অগ্রগতির সুফল পাচ্ছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তাদের আরও কঠোর হতে হবে। বড় বড় দুর্নীতিবাজকে ধরতে হবে। প্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে। তা কমাতে কোনো উদ্যোগ গত বছর ছিল না।