সিআইএ পঁচাত্তরে বাংলাদেশে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করেছিল

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অত্যন্ত গোপন যেসব নথি প্রকাশ করেছে, তার একটিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বৈরিতা বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়।

২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের তারিখ দেওয়া ওই দলিলের একটি অংশে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা, বিশেষ করে ভারতীয় হাইকমিশনারের আহত হওয়ার ঘটনা, যা চরমপন্থীদের কাজ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তা দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের মধ্যে উত্তাপ বাড়িয়েছে।’

নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের পর ভারত যদি বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চাইত, তবে মাত্র তিন দিনের মধ্যে সেনা অভিযানে যেতে পারত। ওই নথিতে ভারতের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া প্রসঙ্গ

কনফিডেনশিয়াল লেখা ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি নথিতে বলা হয়, ইউএস সিনেটের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ কমিটির একজন কর্মকর্তা পিটার ডব্লিউ গ্যালব্রেইথ ওই বছরের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ব্যাক-টু-ব্যাক ফোন করেছিলেন।

দুই নেত্রীই দাবি করেন, সবকিছুর আগে তখনকার রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। দুজনই ৩ মার্চ তারিখে নির্ধারিত সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করেন। দুজনেরই একে অন্যের প্রতি ব্যক্তিগত অপছন্দের বিষয়টি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় বলেও ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়।

তঁাদের ‘ঐকমত্য’ ছিল কেবল ‘একটি পয়েন্টে’। তা হলো এরশাদের অপসারণ। এর বাইরে ঐক্যের কোনো অবস্থান নেই বলেও নথিতে বলা হয়। নথিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীই বিশ্বাস করত যে এরশাদকে যুক্তরাষ্ট্রই ক্ষমতায় রেখেছে।

ভারত প্রসঙ্গে তিনটি নথি

এদিকে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর
সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা সম্পর্কে তাদের পর্যালোচনা ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দপ্তরকে জানিয়েছিল।

সদ্য অবমুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের তিনটি গোপন দলিল (ইন্টারএজেন্সি ইন্টেলিজেন্স মেমোরেন্ডাম) থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এর একটি দলিল ১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বরের এবং দুটি ২৬ নভেম্বরের।

ওই বছরের ৮ নভেম্বর ঢাকা থেকে ডব্লিউ ই কলবির সই করা একটি গোপন সতর্কবার্তায় (ইন্টেলিজেন্স অ্যালার্ট মেমোরেন্ডাম: বাংলাদেশ) ওয়াশিংটনকে জানানো হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হচ্ছে। দ্রুত এটা রোধ করা না গেলে পরিস্থিতি সীমিত পরিসরে গৃহযুদ্ধের (শর্ট অর্ডার টু সিভিল ওয়ার) দিকে ধাবিত হতে পারে। এর ফলে অসংখ্য উদ্বাস্তু ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সেটা হলে ভারতীয় সেনা হস্তক্ষেপ অবধারিত।

ওই বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে স্বাভাবিক কমান্ড-কাঠামো ভেঙে পড়েছে। শোনা যাচ্ছে, বাহিনীর কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা ও কিছু তালিকাভুক্ত ব্যক্তি জিয়াউর রহমানসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তাঁদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কোনো কোনো গ্রুপের আচরণ অতি উগ্রবাদী। এমনকি এর কোনো কোনো গ্রুপ ভারতীয় বাহিনীর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে।

জানা গেছে, নতুন সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক-চতুর্থাংশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরীণ করেছে। তাঁদের অনেকেই ৭ নভেম্বর নিহত মেজর জেনারেল মোশাররফের (খালেদ মোশাররফ) অনুসারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। কনিষ্ঠ কর্মকর্তা ও তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের একটি গ্রুপ নিজেদের ‘রেভল্যুশনারি মিলিটারি কাউন্সিল’ বলে পরিচয় দিচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই বলে সতর্ক করেছেন যে ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আটজন মেজর যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংকক থেকে ঢাকায় ফেরেন, তাহলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কোনো বিকল্পই প্রায় থাকবে না।

গোপন বার্তায় সব শেষে বলা হয়েছে, ‘তবে ভারত বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমরা নিঃসন্দেহ নই। অবশ্য বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু ভারতে ঢুকতে থাকলে এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ যদি দেশটিকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়, তাহলে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে।’

এরপর ২৬ নভেম্বর আরও একটি সতর্কবার্তায় (ইন্টেলিজেন্স অ্যালার্ট মেমোরেন্ডাম) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের কথা ওয়াশিংটনকে জানায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ। ওই বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে ভারতীয় হাইকমিশনারের ওপর একটি উগ্রবাদী গ্রুপের আক্রমণ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

২৬ নভেম্বরই ইন্টারএজেন্সি ইন্টেলিজেন্স মেমোরেন্ডামে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য ভারতের কী ধরনের সামর্থ্য আছে, সে সম্পর্কে অন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ। এতে বলা হয়, ভারত সেনা হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহারে সক্ষম।

সিআইএর সংরক্ষিত তথ্যভান্ডার অবমুক্ত করার দাবি জানিয়ে মাকরক নামের একটি তথ্য অধিকার গোষ্ঠীর দায়ের করা একটি মামলার প্রায় দুই বছরের মাথায় গত বুধবার প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পৃষ্ঠার গোপন নথি সিআইএ অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়। এসব নথির মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তের বহু বিচিত্র বিষয়ে সিআইএর গোপন মূল্যায়ন ও তথ্যসমূহ প্রকাশ করা হয়।