সেই দিনটির কিছু কথা, কিছু স্মৃতি

হুমায়ূন আহমেদ
হুমায়ূন আহমেদ

১৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার ২০১২। নিউইয়র্কে সকাল। আকাশ পরিষ্কার। দুপুর গড়াতেই মেঘ। আকাশ থেকে নেমে আসা অশ্রুধারার মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু-সংবাদ। নিউইয়র্কে প্রবাসীদের কর্মব্যস্ত দিনে হঠাত্ ছন্দপতন। সবার গন্তব্য তখন ইস্ট রিভারের পাশেই বেলভিউ হাসপাতাল। সেখানে ১০তলার একটি কক্ষে নিথর শুয়ে আছেন তাঁদের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ।
ভিড় বাড়তে থাকে ফার্স্ট অ্যাভিনিউর সড়কপথে। দুপুরটি যেন দীর্ঘ হয়। প্রবাসীরা ভিড় করতে থাকেন হাসপাতাল-ফটকে। তাঁদের সামাল দিতে নিরাপত্তাকর্মীদেরও নড়েচড়ে উঠতে হয়। বিমর্ষ জটলায় হঠাত্ই কান্নার শব্দ। প্রবাসী মনিরুল ইসলাম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘নিউইয়র্কে থেকেও একনজর দেখা হয়নি প্রিয় লেখককে।’ মরা মুখটি একবার দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি।
রহমান বাবু নামের প্রবাসী এক ট্যাক্সিচালক থামলেন ফার্স্ট অ্যাভিনিউ আর হাসপাতালের মোড়টিতে। চিত্কার করে বলতে থাকলেন, ‘চিকিত্সা করাতে এনে আপনারা মেরে ফেললেন হুমায়ূন স্যারকে।’ এই প্রশ্নের মুখে নিরুত্তর জটলা। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। দ্রুত পথ চলার ফাঁকে বিদেশিরা জানতে চায়, কী হয়েছে। জানাই, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের জীবনাবসান হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আমরা অপেক্ষা করছি, তাঁর মৃতদেহের জন্য।’ এরই মধ্যে বেলভিউ হাসপাতালের বিশাল ভবনটির সামনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে ঝুলিয়ে দিয়েছেন কোনো এক প্রবাসী। লেখকের জন্য যেন জাতীয় শোক ঘোষিত হয়ে গেছে প্রবাসে।

চিকিত্সা করাতে এসে জ্যামাইকার রকওয়ে বুলেভার্ড আর ১১৬ স্ট্রিটে ভাড়া বাড়িতে উঠেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, স্ত্রী মেহের আফরোজ ও দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত। আজ সেই দোতলা বাড়ি ঘিরে শোকাতুর মানুষজন। সিঁড়িতে নির্বাক দাঁড়িয়ে সদ্য প্রয়াত লেখকের অনুজ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হক। লেখকের প্রিয় কণ্ঠশিল্পী এস আই টুটুলসহ অন্যরা নির্বাক দাঁড়িয়ে। সবার নীরব কান্নায় যেন পরিবেশ তখন অনেক ভারী। অথচ বসার ঘরটিতে হুমায়ূনপুত্র নিষাদ ও নিনিত খেলা করছিল আনমনে।

ওপরতলার বদ্ধ কপাটের ভেতর থেকে মেহের আফরোজ শাওনের কান্নার শব্দ বের হয়ে আসছিল। তিনি বলছিলেন, ‘দেশের কোটি মানুষ দোয়া করলেন, এখন তো আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আমি কী নিয়ে বাঁচব।’

নিজের মৃত্যু নিয়ে নানা কথা লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্যকর্মে। শেষ দিকের লেখায়, নিষাদ-নিনিতের বেড়ে ওঠা দেখার জন্য বেঁচে থাকার আকুতি ছিল তাঁর।

নিউইয়র্কে পরদিনই প্রথম রোজা। নির্ঘুম রাত প্রবাসীদের। জ্যাকসন হাইটস থেকে জ্যাকসনভিল পর্যন্ত শোকের ছায়া। ভোররাতেই ফিউনারেল হোমে পৌঁছি। পরিচালক ব্রুস বেইটস জানালেন, অপেক্ষা করতে হবে পরিবারের অনুমতির জন্য। এর আগে মরদেহ দেখার কোনো উপায় নেই। প্রবাসী যুবক আমিনুল এসেছেন কাকডাকা ভোরে। তাঁর হাতে ‘ফাইনাল স্যালুট’ নামের একটি বই। বইয়ের নামটিকে আমার কাছে খুব প্রতীকী মনে হয়। কেননা কিছুক্ষণের মধ্যে আমরাও ফাইনাল স্যালুট জানাব আমাদের সময়ের নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদকে। কাজে যাওয়ার আগেই প্রিয় লেখককে শেষ দেখা দেখে যাবেন যুবকটি। বিলম্বের কথা জানাতেই চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।

ফিউনারেল হোমের পরিচালক জানালেন, মরদেহকে ধর্মীয় নিয়মে প্রথমে গোসল করাতে হবে। তারপরই সামনের কক্ষে রাখা হবে দর্শনার্থীদের জন্য। এর মধ্যেই ছুটে আসলেন জামাল আবদীন এবং আনিসুর রহমান। দুজনই হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিনের নিকটাত্মীয়। হুমায়ূন আহমেদ যখনই নিউইয়র্কে এসেছেন, তাঁর স্থানীয় অভিভাবক ছিলেন জামাল আবদীন। শেষ যাত্রার সময় ফিউনারেল হোমেও মরদেহ রাখা হয়েছে তাঁরই তত্ত্বাবধানে। আনিসুর রহমান ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের ‘পাশা মামা’।

ফিউনারেল হোমের নিচতলায় হিমঘর। জামাল আবদীন ও আনিসুর রহমানকে অনুসরণ করি। কবরের নিস্তব্ধতা চারদিকে। প্রশস্ত টেবিলে নিষ্প্রাণ শুয়ে আছেন বাংলার জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ। থর থর কাঁপুনি আর অঝর কান্না দেখে জামাল আবদীন আমাকে বসে থাকতে বললেন। আচ্ছাদন সরিয়ে গোসল করানো শুরু হলো। এও এক নিয়মের কাজ। ফিউনারেল হোমের পরিচালক বুঝিয়ে দিলেন কেমন করে কাজটি করতে হবে। অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকি। শেষবারের মতো যেন দেখে নিই প্রিয় লেখকের আপাদমস্তক। দীর্ঘ চিকিত্সা আর হাসপাতালের কাটাছেঁড়ার স্পষ্ট ছাপ শরীরজুড়ে। হাতের আঙুলের দিকে চেয়ে থাকি অনেকক্ষণ। যে আঙুলে কলম ধরে জাদু দেখিয়েছেন, তার কী কোনো আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে—তা পরখ করার চেষ্টা করি। আতর, গোলাপ আর কাফনের কাপড় নিয়ে আসা হলো। পাশেই রাখা কফিন। মৃত ব্যক্তিকে কাফনের কাপড় পরানোর নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিলেন ফিউনারেল হোমের ভিনদেশি পরিচালক। নিষ্প্রাণ দেহটি বড্ড ভারী লাগে। সাদা কাফনের আচ্ছাদনে ঢেকে দেয়ার আগে শেষবারের মতো দেখে নিই কোটি মানুষের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকে। কাঁপা হাতে কিছুক্ষণ চেপে ধরি লেখকের শীতল হাত। ছুঁয়ে দিই হাতের আঙুলগুলো, যে আঙুলে কলম ধরে আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন জীবনভর। শোক, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক মিশ্র শিহরণ। সমস্বরে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল অসহায় মানবদের আর্তনাদ, ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা  ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু...’।