সেবা সহজলভ্য করতে চেয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র মনে করে, চিকিৎসা কঠিন বিষয় নয়। শুরু থেকে সেবার বাণিজ্যিকীকরণ প্রতিরোধে মনোযোগ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নেওয়া অনেক উদ্যোগ আজও ইতিহাসের পাতায় নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবায় এমনই উদ্যোগের নাম ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’। ভারতের আগরতলার কাছে, ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে এই ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলা, হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক-নার্স-চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সংগ্রহ করায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। যুদ্ধ শেষে ওই হাসপাতালেরই চিকিৎসক, নার্স নিয়ে ১৯৭২ সালে গড়ে তুলেছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। গত ৩১ জানুয়ারি নিজ বাসায় এই প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘নামটি মুজিব ভাই-ই (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) স্থির করেছিলেন। আমাদের জন্য সাভারে ৩১ একর জমিরও বন্দোবস্ত করেছিলেন।’

গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মধ্য দিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজের শুরু। সাভারে প্রথমে তাঁবু গেড়ে, তারপর বাঁশের ঘর তুলে চিকিৎসা শুরু। সম্পদ সেবার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। গ্রামের মানুষের ধান-চাল-বাঁশ-ঘর ব্যবহার করে, গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্য জনবলে রূপান্তর করে কাজ এগিয়ে নিয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডি ও সাভারে দুটি টার্শিয়ারি হাসপাতাল রয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে ৬টি প্রাইমারি রেফারেল হাসপাতাল, ২৫টি প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টার এবং ৭টি হেলথ পোস্ট (এখানে রোগী ভর্তি করা হয় না)। রয়েছে মেডিকেল কলেজ ও ওষুধ কারখানা। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, মানুষ সচেতন হলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। তাই মানুষের কাছে সহজে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার কথা পৌঁছে দিতে ৪০ বছর ধরে তাঁরা প্রকাশ করে চলেছেন মাসিক গণস্বাস্থ্য। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বই-পুস্তক অনুবাদ করে প্রকাশ করেন তাঁরা।

ওষুধে সমৃদ্ধ দেশ

১৯৮২ সালের ১২ জুন বাংলাদেশ সরকার ওষুধনীতি চূড়ান্ত করে। ওই ওষুধনীতি প্রণয়নে বড় ভূমিকা ছিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ওই নীতিতে। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করা যাবে না। ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে সরকার। এই নীতি দেশের ওষুধশিল্পের চেহারা বদলে দিয়েছে। দেশি ওষুধ কোম্পানি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দেশের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানির দাপট এখন নেই। দেশ ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ এখন ওষুধ রপ্তানি করে। পরবর্তী সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল কিছু দেশ বাংলাদেশকে অনুসরণ করে নিজেদের মতো করে ওষুধনীতি তৈরির চেষ্টা করেছে।

নারীর হাতে স্টিয়ারিং

প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকেরা বিশ্বাস করতেন, নারীস্বাস্থ্য ঠিক থাকলে পরিবারের স্বাস্থ্য অটুট থাকবে। একেবারে শুরুতে তাঁবুতে চিকিৎসা দেওয়ার সময় গ্রামের নারীরা সেবা নিতে আসতেন না। চিকিৎসকেরা বাড়িতে গেলে নারীরা ঘরের বাইরে বের হতেন না। এই সমস্যার সমাধান হলো গ্রামের নারীদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবায় যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গ্রামের নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্যারামেডিক তৈরি করল। গ্রামের ধাইদের প্রশিক্ষণ দিল। প্রশিক্ষিত নারীস্বাস্থ্যকর্মীরা যখন গ্রামের পথে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি সেবা দিতে গেছেন, তখন বাংলাদেশ অন্য নারীকে দেখতে শুরু করল। পরবর্তী সময়ে এই একই পথ ধরে পেশাজীবী নারী চালক তৈরি করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

অনেক সেবা যে প্রশিক্ষণ পাওয়া সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব, এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। সব সেবাই ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের মাধ্যমে দিতে হবে, এই বিশ্বাস ভাঙার চেষ্টা তাদের ছিল। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তিনটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ১৯৭৪ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৫ সালের জুন পর্যন্ত ৬০০ জন নারীর টিউবেকটমি (স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ) করা হয়। এর মধ্যে ৩৬৬টি টিউবেকটমি করেছিলেন দুই মাসের প্রশিক্ষণ পাওয়া নারী প্যারামেডিকেরা। বাকিগুলো করেছিলেন সনদধারী চিকিৎসকেরা। সংক্রমণ কিছুটা বেশি ছিল যে অস্ত্রোপচারগুলো চিকিৎসকেরা করেছিলেন, সেগুলোতে। গ্রামীণ বাংলাদেশে নারী প্যারামেডিকদের এই সাফল্য নিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এ একটি গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়। সাড়া পড়ে সারা বিশ্বে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্যারামেডিকদের গুরুত্ব বেড়ে যেতে থাকে।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য আন্দোলন

১৯৭৮ সালের আলমা-আটা ঘোষণায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দেওয়া হয় এবং বলা হয়, ২০০০ সাল নাগাদ সবার জন্য স্বাস্থ্য (হেলথ ফর অল) নিশ্চিত করা হবে। সবার জন্য স্বাস্থ্য যে সুদূরপরাহত, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট ছিল। ওই ২০০০ সালেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশে আয়োজন করে পিপলস হেলথ অ্যাসেম্বলি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে বিকল্প ধারার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

সম্মেলন থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পিপলস হেলথ মুভমেন্ট’ নামের আন্তর্জাতিক সংগঠন। বর্তমানে ৭০টির বেশি দেশের স্বাস্থ্য সংগঠন এই আন্দোলনের সদস্য। পরবর্তী সম্মেলন হয়েছিল ২০০৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে, ২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে আবার বাংলাদেশে।

প্রতিষ্ঠানের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সব সময় চিকিৎসাকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছে। আর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র চিকিৎসাকে ‘ডিমিস্টিফাই’ করার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ এটা রহস্যে ঘেরা, কঠিন বা জটিল কোনো বিষয় নয়।