সৌরভে ম-ম ফুলের উৎসব

বাংলা একাডেমির মাঠে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের ফুল উৎসব। ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে প্রাঙ্গণ। ফুলের টানেলের সামনে সেলফি তুলতে মগ্ন পুষ্পানুরাগীরা l ছবি: প্রথম আলো
বাংলা একাডেমির মাঠে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের ফুল উৎসব। ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে প্রাঙ্গণ। ফুলের টানেলের সামনে সেলফি তুলতে মগ্ন পুষ্পানুরাগীরা l ছবি: প্রথম আলো

হাতিটি দাঁড়িয়ে আছে শুঁড় উঁচিয়ে। হলুদ গাঁদার সেই শুঁড়। মাথায় টকটকে লাল গোলাপের তাজ। কাঁধের নিচে কমলা ত্বক জারবেরা ফুলের। কামিনী পাতায় সবুজ শরীর। পিঠের ওপর থেকে ঝুলছে গাঁদা ফুলের ঝালর। এমন যে ঐরাবত, তার সঙ্গে ছবি তুলতে সাধ হবে না কার? আর ক্যামেরা বস্তুটি এখন যখন সবার হাতে হাতে, তখন তো ছবি তুলতে ভিড় জমে যাবেই।

তাই হয়েছে বাস্তবে। বাংলা একাডেমির মাঠে ফুল উৎসবের প্রথম দিনেই পুষ্পানুরাগীদের সমাগম ঘটেছে বিপুল। বটতলাকে ঘিরে মাঠের চারপাশ দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল। আর ভেতরে কোথাও হাতি তো কোথাও ঘোড়া। মগবাজার থেকে মা রীতার সঙ্গে উৎসবে এসেছে তাসনিম মুনতাহা আর তাহমিদ। ফুলের হাতি-ঘোড়ার সঙ্গে ছবি তুলতে তারা ব্যতিব্যস্ত। মাঠের কোথাও আবার গুচ্ছ গুচ্ছ গাঁদা দিয়ে তৈরি রিকশা, কোথাও লাল গোলাপভরা তোরণ। ফুলে ফুলে সাজানো এক সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে আমতলায়। তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা, কেউ কেউ জুটি বেঁধে। পুষ্পশোভিত ক্ষণটি ধরে রাখছেন সেলফোনের ক্যামেরায়। ফলে ঢাকার রাজপথের যানজটের মতো টানেলের ভেতরে বেশ জনজট।

ফেসবুকে উৎসবের বিষটি জেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন স্থানীয় প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষক পারভিন আক্তার। তিনি
অ্যাগ্রোব্যাক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্টল থেকে কিনেছেন স্টেমা, জারবেরাসহ বেশ কিছু গাছের চারা। বললেন, এখানে বেশ সুলভে পাওয়া যাচ্ছে। দীপ্ত অর্কিড ও ডানকান ব্রাদার্সের স্টলে ফুল ছাড়াও রয়েছে হরেক রকমের অর্কিডের চারা। এক শ টাকায় মিলবে এক শ লাল গোলাপ। এখানে অন্য সব ফুলও খুচরা কেনা যাবে পাইকারি দামে।

গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে বাংলা একাডেমির মাঠে তিন দিনের এই ফুল উৎসব শুরু হয়েছে ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার ফর এন্টারপ্রাইজেস (আইআইসিই) ও বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির যৌথ আয়োজনে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে উৎসব প্রাঙ্গণ। প্রধান অতিথি হিসেবে বিকেলে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাংসদ মকবুল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামাল উদ্দিন আহমেদ, সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক, কৃষিবিদ হামিদুর রহমান, আইআইসিইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন মোশাররফ। সভাপতিত্ব করেন ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম।

আয়োজকেরা জানালেন, উৎসবে ১৪টি প্যাভিলিয়ন আর ৩৩টি স্টল রয়েছে। দেশর বিভিন্ন এলাকার ফুলচাষি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, নার্সারি, ফুল উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত প্রতিষ্ঠান, সাজসজ্জা ও রূপচর্চা প্রতিষ্ঠান এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অংশ নিয়েছে মেলায়। প্রায় এক হাজার রকমের ফুল আর ফুলের চারার সমারোহ ঘটেছে এখানে। আজ সকালে শুক্রবার শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং ছাদে ফুলের বাগান, বিকেলে ফুলসজ্জা নিয়ে কর্মশালা। এ ছাড়া ফ্যাশন শো, সেমিনার পুরস্কার বিতরণী রয়েছে উৎসবের তিন দিনের কর্মসূচিতে।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম জানালেন, এখন দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। সারা দেশে ফুলের বাজার প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার। এর সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নানাভাবে জড়িত। বিশ্ববাজারে ফুল রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবছর ফুলের বাজারের লেনদেন প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ফুলচাষিদের সহায়তা দিতে কৃষি কর্মকর্তার অভাব। ফুলচাষিরা অনুমান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে চাষ করছেন। ফুলের কোনো স্থায়ী পাইকারি বাজার নেই। রাজধানীর শাহবাগ ও আগারগাঁও এর বাজার দুটি অস্থায়ী এবং অপরিসর। সংরক্ষণেরও অভাবে এই দুই বাজারে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার ফুল নষ্ট হয়। তিনি সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থাসহ রাজধানীতে ফুলের একটি স্থায়ী পাইকারি বাজার ও ফুল নিয়ে একটি গবেষণাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করেন।