স্কুল খোলার ঘোষণায় দরজির দোকানে দৌড়ঝাঁপ
বাড়িতে বসে অনলাইনে ক্লাস করতে করতে এক ক্লাস পার হয়ে গেল আহানাফ আদিয়াত। অনলাইনে ক্লাস করলেও তাকে স্কুলের নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরতে হয়। তবে ক্যামেরায় দেখা যায় না বলে বাসায় পরা পায়জামা–হাফপ্যান্টের ওপর দিব্যি শুধু শাটর্টা চাপিয়ে নিলেই চলেছে। পায়ে স্যান্ডেল রইল নাকি খালি পা, সেটা নিয়েও মাথা ঘামাতে হয়নি। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল খোলার ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে মা ফারজানা রহমান ইউনিফর্মের বাকি অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন, ছেলের প্যান্ট কোমর পর্যন্ত আসছে না, জুতাজোড়াও পায়ে ঢুকছে না।
আহানাফ নেভি অ্যানকোরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঢাকার খিলক্ষেত শাখার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র (১২)। মা ফারজানা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত শুনেছেন ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস এক দিন হবে। ক্লাসে যাওয়ার আগে ছেলের প্যান্ট বানাতে হবে, জুতা কিনতে হবে। শার্টও ছোট হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস আগে কিনেছেন বলে এখন কাজ চলবে। তিনি জানান, ওই স্কুলের কেজি শ্রেণিতে পড়ে তাঁর মেয়ে (৬)। মেয়েরও ইউনিফর্ম–জুতা ছোট হয়েছে। তবে প্রাক্–প্রাথমিকের ক্লাস এখন শুরু হবে না বলে মেয়ের ইউনিফর্ম বানাবেন না।
স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত আসায় ফারজানার মতো আরও অনেক অভিভাবককে, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের নতুন ইউনিফর্ম সংগ্রহের জন্য ছুটতে হচ্ছে। কারও ইউনিফর্ম ছোট হয়ে গেছে। কারও ইউনিফর্ম পুরোনো হয়ে গেছে বা হলদে ছোপ পড়েছে। রাজধানীর স্কুলগুলোর অধিকাংশেরই নির্ধারিত এক বা একাধিক দরজি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্কুলশিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ইউনিফর্ম মাপ দিয়ে বানিয়ে নেন। আবার কোনো কোনো স্কুলে বিভিন্ন মাপের তৈরি ইউনিফর্ম কিনতে পাওয়া যায়।
দেশে কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় সরকার। দেশে প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত সরকারি–বেসরকারি মিলিয়ে দেড় লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সোয়া তিন কোটির মতো।
অতিরিক্ত সময়ে কাজ করতে হচ্ছে
নেভি অ্যানকোরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইউনিফর্ম তৈরির কাজ করে কাজী সোর্সিং নামের একটি দরজি প্রতিষ্ঠান। করোনাকালে স্কুল কর্তৃপক্ষ শনি ও রোববার দুদিন এই প্রতিষ্ঠানের দরজিদের স্কুলে উপস্থিত থাকার অনুমতি দিয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীর ইউনিফর্ম বানানোর প্রয়োজন হলে ওই দুদিন স্কুলে গিয়ে মাপ দিয়ে আসে। গত তিন–চার মাসে এক সপ্তাহে একটি করে অর্ডার পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ সপ্তাহে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। স্বত্বাধিকারী কাজী মোসলেহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, গত শনি ও রোববার তিনি ১২০টি ইউনিফর্মের অর্ডার পেয়েছেন। এর মধ্যে পঞ্চম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অর্ডার বেশি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে দরজি আছেন ১০ জন। অতিরিক্ত অর্ডারের জন্য এখন তাঁকে আরও ৫ জন দরজি চুক্তভিত্তিক নিতে হয়েছে। আগে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান খোলা থাকত। দুদিন ধরে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হচ্ছে। তিনি জানান, প্লে–গ্রুপ থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ টাকা ইউনিফর্মপ্রতি খরচ নেন।
অর্ডার এসেছে, আসছে, কেউ অপেক্ষায়:
মঙ্গলবার বনানী সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা গেল, সেখানের স্টার টেইলার্স ও গুডলাক টেইলার্স নামে দুটি দরজি প্রতিষ্ঠান স্কুলের ইউনিফর্ম তৈরির কাজ করে। দুটি প্রতিষ্ঠানই সাঁতারকুলে অবস্থিত স্যার জন উইলসন স্কুলের ইউনিফর্ম তৈরি করে।
স্টার টেইলার্সে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল (বিআইটি), স্কলাস্টিকা ও বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইউনিফর্মও তৈরি হয়। স্বত্বাধিকারী কাজী মোজাম্মেল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, ২৫ বছর ধরে তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে স্যার জন উইলসন স্কুলের ইউনিফর্ম বানানো হয়। এই স্কুলে বিত্তবানদের সন্তানেরা পড়ে বলে বছরে দুইবার করে একেক শিক্ষার্থীর চার থেকে ছয় সেট ইউনিফর্ম বানানো হতো।
গত দেড় বছরে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া তাঁরা ইউনিফর্মের অর্ডার পাননি। তিনি বলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ওই স্কুলের ২০০টি ইউনিফর্মের অর্ডার পেয়েছেন। অন্য স্কুলগুলোর ৪০টির মতো ইউনিফর্মের অর্ডার পেয়েছেন। সবার ইউনিফর্ম ছোট হয়ে গেছে। যাদের সাদা ইউনিফর্ম, তাদের অনেকের পোশাকে হলদে ছোপ পড়েছে।
ওপরের তাকে সারি সারি করে রাখা প্রতিষ্ঠানের ব্যাগ দেখিয়ে বললেন, গত বছর এই ইউনিফর্মগুলো অর্ডার নেওয়া হয়েছিল। পরে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব আর বিক্রি হয়নি। করোনাকালে তাঁকে নানাভাবে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ইউনিফর্ম ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে বানানো হয়।
গুডলাক টেইলার্সের মালিকের ছেলে জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, দেড় বছরের মধ্যে গত দুদিন স্যার জন উইলসন স্কুলের ১৫–১৬টি ইউনিফর্মের অর্ডার পেয়েছেন।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ভেতর জগন্নাথপুর বসুন্ধরা রোডে অবস্থিত হাভেলি কমপ্লেক্স ভবনের দুটি দরজি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেল, তারাও অল্প স্বল্প অর্ডার পাওয়া শুরু করেছে। লাবণ্য বুটিকস অ্যান্ড টেইলার্সের প্রধান দরজি মো. জুয়েল প্রথম আলোকে জানালেন, তাঁরা স্থানীয় প্রত্যয় আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইউনিফর্ম বানান। বছরে ১২০–১৩০টি ইউনিফর্ম বানালেও গত বছর স্কুল বন্ধ থাকায় কোনো অর্ডার পাননি। দীর্ঘদিন পর গত দুদিনে ৫টি অর্ডার পেয়েছেন। আরও আসবে।
পাশের লেডিস ফ্যাশন নামের দরজি প্রতিষ্ঠানের কারিগর অমিত হাসান প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার ৩টি ইউনিফর্মের অর্ডার পেয়েছেন।
ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কে হ্যাপি আর্কেড শপিং মলে অবস্থিত ড্রেস মেকার নামের দরজি প্রতিষ্ঠানটি শুধু স্কুলের ইউনিফর্ম বানাত। স্কুল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। ১১ আগস্ট খোলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। করোনাকালে বেইলি রোডের শাখাটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সানজিদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ধানমন্ডির সাউথ ব্রিজ স্কুল এবং এক্সেল একাডেমি মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ শর মতো তৈরি ইউনিফর্ম বিক্রি করেন। নতুনভাবে আবার অর্ডার নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
প্রথম দিন ইউনিফর্ম ছাড়াই যেতে হতে পারে
রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বারিধারা শাখায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে আফনান আলাভি। অনলাইন ক্লাসের জন্য তাদের ইউনিফর্ম পরার বাধ্যবাধকতা ছিল না। আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা পোশাকটি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, সেটি আর আফনানের গায়ে লাগবে না। তার চিকিৎসক মা রায়হান ই জান্নাত প্রথম আলোকে জানান, বাড়ন্ত বয়সের শিশু–কিশোরদের ইউনিফর্ম এমনিতেই বছরে দুইবার কিনতে হয়। গত দেড় বছরে ছেলে বেশ লম্বা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, স্কুল থেকে তৈরি ইউনিফর্ম কিনতে হয়। যদি স্কুল খোলার আগে ইউনিফর্ম বিক্রি শুরু হয়, তাহলে কিনে নেবেন। তা না হলে প্রথম দিন ইউনিফর্ম ছাড়াই সাধারণ পোশাকে আফনানকে ক্লাসে যেতে হবে।
রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মাহির আহনাফ খানের মা জাকিয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, অনলাইন ক্লাসের জন্য ইউনিফর্ম পরতে হয়নি বলে গত দেড় বছরে নতুন করে কেনার প্রয়োজন হয়নি। স্কুল খোলার আগেই তৈরি ইউনিফর্ম কেনে নেবেন।