স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : আজ পর্ব—১৩
স্বাস্থ্যসেবায় জনসম্পৃক্ততার পথ দেখিয়েছে চৌগাছা
২০১১ সালে চৌগাছা উপজেলা হাসপাতালে ৪ হাজার ৪১৩টি প্রসব হয়, যা ওই বছর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও হয়নি।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে সেবার পরিমাণ ও গুণগত মান বাড়ে। যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্বাস্থ্যসেবার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। প্রায় ২৭ বছর পর একই কাজ শুরু হয় ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে। সফল উদাহরণ তৈরি হওয়ার পর এই উদ্যোগ এখন চৌগাছা-ঝিনাইদহ (সি-জে) মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
১৯৭৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলমা-আটা ঘোষণায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের বা কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা কঠিন। বেশ কিছু দেশের আমলাতন্ত্র ও আইন এটা সমর্থন করে না, অনেক ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও সেই কঠিন কাজটি করেছেন ডা. মো. এমদাদুল হকসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
এমবিবিএস পাস করার এক বছর পর ১৯৮৫ সালে এমদাদুল হক চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তখন চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ছিল টালির ছাউনির একটি ঘরে। তরুণ চিকিৎসকেরা উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে হাসপাতাল সম্প্রসারণ করেন। সেখানে চালু হয় হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি।
যুক্ত হয় মানুষ
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়সহ সব ধরনের জনবল নিয়োগ দেয় সরকার। অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনে বা সরবরাহ করে সরকার। কোনো ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তা-ও পূরণ করে সরকার। এমদাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ সেবা না পেয়ে যেন ফিরে না যায়, এটা আমাদের লক্ষ্য ছিল। আমরা ঘাটতিগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি। আর চেষ্টা করি সরকার যা কিছু দেয়, তার কোনো কিছুই যেন অপচয় না হয়।’
শুরুতে উপজেলা চেয়ারম্যান হাসপাতাল সম্প্রসারণে পাবলিক লাইব্রেরি ছেড়ে দেন। টিকা রাখার জন্য কিনে দেন একটি ফ্রিজ। অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হতো উপজেলা পরিষদের গাড়ি। চালু হয় ছয় শয্যার অন্তর্বিভাগ সেবা। এসব কাজে চিকিৎসক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা যুক্ত ছিলেন। সফল টিকাদান কার্যক্রমের জন্য ১৯৮৯ সালে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পায় চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
‘মানুষ সেবা না পেয়ে যেন ফিরে না যায়—এটা আমাদের লক্ষ্য ছিল। আমরা ঘাটতিগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি। আর চেষ্টা করি সরকার যা কিছু দেয়, তার কোনো কিছুই যেন অপচয় না হয়।’ডা. মো. এমদাদুল হক, ঝিনাইদহ সদর ও চৌগাছা হাসপাতালকে বদলে দেওয়ার নায়ক
ওই বছর নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হওয়ার পর সেখানে একই ধরনের কাজ শুরু করেন এমদাদুল হক। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাসহ উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন কর্মকর্তা, শিক্ষক, সমাজকর্মী, লোহাগড়ায় জন্মগ্রহণকারী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করেন।
ইতিমধ্যে ১৯৯৪ সালে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করে সরকার। সেই সময়কার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুল মান্নান গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে হাসপাতালে ৬ শয্যার প্রসূতি ওয়ার্ড চালু করেন। ১৯৯৫ সালে চৌগাছায় আবার ফিরে আসেন এমদাদুল হক। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে জন্ম-মৃত্যু তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়, চালু হয় স্বাস্থ্য শিক্ষা, ওআরটি কর্নার, ইপিআই কর্নার।
এভাবে প্রতিবছর নতুন নতুন সেবা ও কাজ বাড়তে থাকে। ওই সময় সরকারের উদ্যোগ ছিল প্রশিক্ষিত দাইয়ের মাধ্যমে বাড়িতে প্রসবসেবা বাড়ানো। কিন্তু চৌগাছার চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন হাসপাতালে প্রসবের সংখ্যা বাড়ানোর। তাঁরা প্রসব-পূর্ব সেবা বাড়ালেন, নিরাপদ রক্তের আয়োজন বাড়ালেন। চালু করা হলো হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা প্রসূতিসেবা।
এসব কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল হাসপাতালে ছিল না। ছাত্রীদের সেবার কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করা হয়। এঁদের মাসে ১২০০ থেকে ১৪০০ করে টাকা দেওয়া হতো। এসব টাকা তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হতো। কিছু টাকা চিকিৎসকেরা বেতন থেকে দিতেন, কিছু টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আইনজীবীদের কাছ থেকে আসত।
এর প্রভাব সেবার ওপর কতটা পড়েছিল তা প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায়। ১৯৯৬ সালে হাসপাতালে প্রসব হতো ২ শতাংশ। আর ২০১২ সালে সেই হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। ২০১১ সালে চৌগাছা উপজেলা হাসপাতালে ৪ হাজার ৪১৩টি প্রসব হয়েছিল। ওই সংখ্যক প্রসব ওই বছর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও হয়নি। ২০০৪ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর প্রসূতিসেবায় দেশের সেরা হাসপাতালের স্বীকৃতি পায় চৌগাছা।
সি-জে মডেল
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালও বদলে দিয়েছেন এমদাদুল হক। ২০১২ সালে এই হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তখন ১০০ শয্যার হাসপাতালে আয়া, ওয়ার্ড বয়, গার্ড, গার্ডেনার, ট্রলিম্যান, ইলেকট্রিশিয়ানের পদ ছিল না। ৩৬ জন ক্লিনারের প্রয়োজন ছিল, কাজ করতেন ৬ জন। ঝিনাইদহ পৌর মেয়র সাইদুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে সেই হাসপাতালকেও বদলে দিলেন এমদাদুল হক।
সাইদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবায় আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন ডা. এমদাদ। এখন আমি মানুষকে বলি হাসপাতাল আপনার, হাসপাতালকে ভালো রাখার দায়িত্বও আপনার।’ ২০১৬ সালে শ্রেষ্ঠ মানসম্পন্ন জেলা হাসপাতালের জাতীয় স্বীকৃতি পায় ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল। এই হাসপাতাল পরিচালনায় আছে একটি স্বাস্থ্য কমিটি। এর প্রধান পৌর মেয়র। প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা হাসপাতালের জন্য খরচ করে কমিটি।
সারা দেশে ছড়ানোর উদ্যোগ
স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার ফলে প্রথমে চৌগাছা উপজেলা হাসপাতালে এবং পরে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর নজর রাখছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ, গবেষক সর্বোপরি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এঁদের কাজের সঙ্গে একসময় জাপানের সংস্থা জাইকা এবং জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফও যুক্ত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০১৬ সালে ১০টি জেলা হাসপাতালে সি-জে মডেল সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। পরে ২০টি জেলা ও ৫টি উপজেলা হাসপাতালে তা সম্প্রসারণের জন্য একটি কর্মকৌশলের খসড়া তৈরি করা হয়।
২০২০ সালের শুরু থেকে করোনা মহামারি শুরু হওয়ায় সেই কাজ থেমে আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা প্রথম আলো বলেন, চৌগাছা বা ঝিনাইদহের উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। সরকারের নির্দেশ ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান নিজের মতো করে উদ্যোগ নিচ্ছে। অনেক স্থানে বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অনেক সাংসদ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি একই কাজ করছেন।