১ থেকে ১০০ গরু
‘অভাবের সংসার। বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া ও লেখাপড়া বন্ধ করে দিই। তখন বয়স ১৪-১৫ বছর। বৃদ্ধ মা-বাবা। এই অবস্থায় বড় দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছিল গাভি পালন। একটা বকনা গরু (গাভি) ছিল। সেই ১টি গরু থেকে আমাদের খামারে এখন ১০০ গরু। খামারের গরু থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে আমাদের অভাব দূর হয়েছে।’ কথাগুলো ৩৩ বছরের যুবক সজীব মালিথার। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের দিয়াড় বাঘইল গ্রামে তাঁর বাড়ি। পরিবারের বড় রহিম মালিথা ও মেজো ভাই জহুরুল ইসলামের সহযোগিতায় ১৫ বছর ধরে সজীব সেখানে গড়ে তুলেছেন দেশীয় জাতের গরুর খামার। শুরুতে মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকায় কেনা হয়েছিল একটি গাভির বাছুর। বর্তমানে সেই খামারে ১০০টি গরু রয়েছে। প্রতিটি গরুর দাম ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে খামারে মোট ১৬ লাখ টাকার গরু রয়েছে।
খামারের আয় থেকে সজীবের তিন ভাইয়ের নামে কেনা হয়েছে ২০ বিঘা জমি (ফসলি)। এ জমির বর্তমান মূল্য সাত লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৩ সদস্যের একান্নবর্তী এই পরিবারের দৈনন্দিন ও মাসিক সংসারের খরচ আসে গরুর খামারের আয় থেকে। প্রতিদিন খামারে দুধ উৎপাদিত হয় ৪০ কেজি। এ দুধ বিক্রি করে মাসে আয় হয় ৪৮ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বছরে গরু বিক্রি থেকে আয় হয় সাত থেকে আট লাখ টাকা। সব মিলিয়ে খামার থেকে সজীবের পরিবারের আয় বছরে ১৬ লাখ টাকা।
২০০০ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। সংসারে অভাব-অনটন। দিন কাটে না। বাবা নিয়ামত মালিথা একজন প্রান্তিক কৃষক। ১৬ কাঠা জমি আছে। সেখানেই বাড়িঘর, চাষাবাদ। কিন্তু এতে তো সংসার চলে না। সজীব বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। যখন তাঁর বয়স ১৪-১৫ বছর, তখন বড় জাতের চারটি ছাগল ছিল তাঁদের বাড়িতে। ভাইদের পরামর্শে ১ হাজার ৮০০ টাকায় ছাগল চারটি বিক্রি করে দেন। এরপর সেই টাকায় স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বড় দেশি গাভির বাছুর কেনেন। কিছুদিন পর আরেকটি গাভি কেনা হয়। দেড় বছরের মধ্যে দুটি গাভি দুটি বাচ্চা দেয়। এ দুটিও গাভি ছিল। সজীব বলেন, ‘ভাগ্যটা আমাদের খুব ভালো ছিল। কারণ, পরপর ছয়বার আমাদের গাভিগুলো যে বাচ্চা দেয়, সেগুলোও সব ছিল গাভি জাতের।’ এভাবে খামারে গাভির সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে এঁড়ে গরুগুলো বিক্রি করা হতো। এভাবে গত ১৫ বছরে খামারে গরুর সংখ্যা বেড়ে হয় ১০০টির বেশি।
সজীবের বড় ভাই রহিম মালিথা বলেন, প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে গরুর খামারে আসেন তিন ভাই। গরুগুলোকে খাওয়ানোর শেষ হলে নেওয়া হয় পাকশীর পদ্মা নদীর চরে। সেখানে সারা দিন মাঠে চরানো হয় গরুগুলো। দুপুরে খাবার আর বিশ্রাম চরেই হয় তিন ভাইয়ের। সূর্যাস্তের আগে গরুগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হয় খামারে। এভাবে চলছে ১৪-১৫ বছর। সজীবের মেজো ভাই বলেন, গরু তাঁদের নতুন জীবন দিয়েছে। এ কারণে আজ তাঁদের অভাবও দূর হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে না পারায় তাঁদের খামার পরিচালনায় অনেক সমস্যা হয়। তবু তিন ভাই মিলে কাজগুলো করেন। এর মধ্যে সজীব সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন। ছোটবেলা থেকে তাঁর আগ্রহ ও পরিশ্রমে খামারটি এলাকার আদর্শ খামার হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। আশপাশের এলাকা থেকে অনেক খামারি তাঁদের খামার দেখতে আসেন।
সদ্য বদলি হওয়া ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মহিরউদ্দিন বলেন, ‘আমরা জেনেছি, ওই খামার একটি গরু দিয়ে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে অনেক গরু হয়েছে।’
সজীব আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে দেশে অনেক খামারি রয়েছেন, যাঁরা সরকারি সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। সেসব খামারে ১০০ থেকে ২০০ গরু রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে খামারটি গড়ে তুলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি দেশি গরুর একটি বড় খামার গড়ে তুলতে পারবেন।