নিরাপদ মাতৃত্ব: ২১ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন
১০ বছরে পরোক্ষ কারণে মাতৃমৃত্যু বেড়েছে ৩৯%

মাতৃমৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ কমলেও গত ১০ বছরে পরোক্ষ কারণে মৃত্যুর হার বেড়েছে ৩৯ শতাংশ৷ আর এই দুই কারণ মিলে প্রতিদিন গড়ে ২১ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে৷
সরকারের জরিপ ও প্রভাবশালী চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এর বিশ্লেষণ থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে৷
ল্যানসেট ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১৮৮টি দেশের মাতৃমৃত্যুর তথ্য, প্রবণতা ও কারণ বিশ্লেষণ করেছে৷ মাতৃমৃত্যুর হার কমার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে সাময়িকীটি বলেছে, ২০১৫ সালের মধ্যে মাত্র ১৬টি দেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি-৫) অর্জন করতে পারবে৷ এই তালিকায় বাংলাদেশ নেই৷ ল্যানসেট-এর অনলাইন সংস্করণে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়৷
সর্বশেষ মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক জরিপ—বাংলাদেশ মেটারনাল মরটালিটি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সার্ভে ২০১০-এ বলা হয়, প্রতি হাজার জীবিত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে পরোক্ষ কারণে মারা গেছেন ৬৮ জন মা৷ অথচ একই বিষয়ে ২০০১ সালে প্রথম জরিপের তথ্য হচ্ছে, একই কারণে মায়ের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৯৷ এই হিসাবে গত ১০ বছরে মৃত্যুহার বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ৷
বাংলাদেশে গর্ভধারণের সময় থেকে সন্তান প্রসবের পর ৪২ দিন পর্যন্ত দুর্ঘটনা ছাড়া মায়ের মৃত্যুকে মাতৃমৃত্যু বলা হয়৷ মৃত্যুর পরোক্ষ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, ক্যানসার, স্থূলতা, যক্ষ্মা, রক্তস্বল্পতা, হেপাটাইটিস বি, বেশি বয়সে প্রথম সন্তান ও বেশি সন্তান নেওয়া, এইচআইভি, এইডস, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি৷
‘বাংলাদেশ মেটারনাল মরটালিটি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সার্ভে ২০১০’ শীর্ষক গবেষণা দলের সদস্য ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সহযোগী বিজ্ঞানী কামরুন নাহার৷ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের গর্ভকালীন সেবা কার্যক্রমের আওতায় এমন কোনো কর্মসূচি নেই, যাতে পরোক্ষ কারণকে গুরুত্ব িদয়ে মায়ের মৃত্যু কমানো যায়৷ গর্ভধারণের আগে এবং পরে বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমে এ ধরনের অসুখে আক্রান্ত মায়েদের শনাক্ত করে সেবার আওতায় আনা সম্ভব। এ ছাড়া জরায়ুমুখের ক্যানসারের টিকা এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতায় কিশোরীদেরও আনতে হবে।
এমডিজি অর্জন নিয়ে সংশয়: মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করলেও এ ক্ষেত্রে এমডিজি অর্জিত হচ্ছে না বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ১৪৩ অর্জন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে এক লাখ জীবিত জন্মে ১৭০ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। ল্যানসেট বলছে এই সংখ্যা ২৪২।
ল্যানসেট-এর তথ্যের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রাথমিক স্বাস্থ্য) আবু জাফর মোহম্মদ মুসা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১০ সালের বাংলাদেশ মাতৃ স্বাস্থ্য জরিপে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৯৪। বর্তমানে ১৭০।
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ ল্যানসেট-এর গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মাতৃমৃত্যু’ সংজ্ঞার পার্থক্যের কারণে সংখ্যার কিছু তারতম্য হতে পারে। গর্ভধারণজনিত জটিলতা, প্রসবকালে এবং প্রসবের পর এক বছর সময়ের মধ্যে প্রসূতির মৃত্যুই মাতৃমৃত্যু। তিনি বলেন, প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে মাতৃমৃত্যু কমলে এমডিজি অর্জন সম্ভব হতো।
সরকার কী করছে: ল্যানসেট-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন বাংলাদেশে গড়ে ২১ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে।
মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে: রক্তক্ষরণ (৩১ শতাংশ), খিঁচুনি বা একলাম্পশিয়া (২০ শতাংশ), বিলম্বিত প্রসব (৭ শতাংশ), গর্ভপাত (১ শতাংশ), অন্যান্য প্রত্যক্ষ কারণ (৫ শতাংশ), পরোক্ষ কারণ (৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে আছে: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগসহ অন্যান্য কারণ এবং কারণ অজানা (১ শতাংশ)।
পরোক্ষ কারণের বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এমডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মাতৃমৃত্যুর শুধু প্রত্যক্ষ কারণ কমালেই হবে না, পরোক্ষ কারণের দিকেও নজর দিতে হবে।
গত রোববার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) রেজওয়ানা ইয়াসমিন নির্ধারিত সময়ের আগেই স্বল্প ওজনের এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। জন্মের পর থেকে নবজাতক শ্বাসকষ্টে ভুগছে।
রেজওয়ানা জানান, গর্ভে সন্তান আসার দুই মাস পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রথম জানতে পারেন তাঁর ডায়াবেটিস আছে। গর্ভধারণের পুরো সময় ইনসুলিন নিয়েও তা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। গর্ভাবস্থায় তিনি বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হন। তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস আছে। চিকিৎসক তাই এ বিষয়ে পরীক্ষা করতে বলেন। তখনই জানা যায় বিষয়টি। বাচ্চা নেওয়ার আগে কোনো ধরনের পরীক্ষাই করি নাই।’
রেজওয়ানার প্রথম সন্তান নেওয়ার জন্য বয়সটাও বেশি ছিল। সব মিলে গর্ভকালীন জটিলতার পরিমাণ বেড়েছে। তবে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় মেনে চলেছেন বলে হয়তো মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছেন। কিন্তু অনেক মা এ ধরনের পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত বা বিশেষ সেবা পান না।
বিএসএমএমইউর প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম তাঁর এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রথম সন্তান গর্ভে আসার পরই সেই নারীর হৃদ্রোগ ধরা পড়ে। তবে স্বামীর ছেলেসন্তান লাগবে তাই বাধ্য হয়ে সেই ঝুঁকির মধ্যে নারীকে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে হয়েছে। এবারও মেয়েসন্তান হওয়ায় সেই নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ করানোর জন্য স্থায়ী পদ্ধতির অনুমতি দেননি তাঁর স্বামী। তার মানে এই নারীকে আবারও মা হওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে। তাই নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পরোক্ষ মাতৃমৃত্যুর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশও সূচকে পিছিয়ে পড়েছে৷